২৯ কার্ড গেম খেলার নিয়ম

২৯ কার্ড গেম খেলার নিয়ম

আমাদের দেশে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, “তাস দাবা পাশা, এ তিন সর্বনাশা”। তবে এই প্রবাদের বিপক্ষে আমার অবস্থান। তাসকে আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন তা আপনার ব্যাক্তিগত পছন্দ। আপনি যদি এটিকে নিছক একটি খেলা হিসেবে আনন্দ লাভের উদ্দ্যেশ্যে অথবা সময় কাটানোর জন্যে নেন তাহলে সমস্যার কিছু নেই। অনেক সময় বন্ধুদের আড্ডায় বরং এটি না জানার কারনে ছোট হতে হয়। যে কোন কাজ আপনি করেন বা না করেন সেটা কোন ব্যাপার নয় কিন্তু কাজটা কিভাবে করতে হয় তা অবশ্যই জানা থাকতে হবে – এটা আমার থিউরী। প্রচলিত আছে, বায়ান্ন কার্ডে নাকি তিপ্পান্ন খেলা। তবে বাস্তবে কতগুলো খেলা আছে তার সঠিক হিসাব আমার জানা নাই। বায়ান্ন তাসের খেলা গুলোর মধ্যে আমাদের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ২৯ কার্ড গেম। আজকে আমরা ২৯ কার্ড গেম খেলার নিয়ম গুলো জানবে।

কার্ডের নাম ও ধরণঃ

কার্ড গেমে প্রধানত চার ধরণের কার্ড থাকে। এগুলো হলো

  1. হার্ট
  2. ডায়মন্ড
  3. স্পেড
  4. ক্লাবস
২৯ কার্ড গেম

এছাড়াও আরেক ধরণের কার্ড থাকে, তা হলো জুকার। তবে এই কার্ড গুলো ২৯ কার্ড গেম খেলার জন্যে প্রয়োজন হয় না।  

চার ধরণের কার্ডের মধ্যে প্রত্যেক প্রকারের ১৩ টি করে মোট ১৩*৪=৫২ টি কার্ড থাকে।

২৯ কার্ড গেম খেলায় কার্ডের পয়েন্টঃ

তাস খেলার কার্ড

আমি আগেই বলেছি প্রত্যেক প্রকারে মোট তেরোটি করে কার্ড থাকে অর্থাৎ ১৩ টি হার্ট, ১৩ টি ডায়মন্ড, ১৩ টি স্পেড এবং ১৩ টি ক্লাবস থাকে। এই তেরোটি কার্ডের আলাদা পয়েন্ট এবং মূল্যমান রয়েছে। নিচে ক্রমানুসারে পয়েন্টসহ মূল্যমান দেখানো হলোঃ

ক্রমিক নং কার্ডের নাম পয়েন্ট
J (গোলাম)
9 (নক্কা)
A (টেক্কা)
10 (দশ বা টেন)
K (কিং)
Q (কুইন)
8 (এইট বা আট)
7 (সেভেন বা সাত)
6 (সিক্স বা ছয়)
১০ 5 (ফাইভ বা পাঁচ)
১১ 4 (ফোর বা চার)
১২ 3 (থ্রী বা তিন)
১৩ 2 (টু বা দুই)

তবে ২৯ কার্ড গেমের মূল খেলায় প্রথম আটটি কার্ড থাকে, নবম কার্ডটি (6) স্কোরিং এর জন্যে এবং বাকী কার্ডগুলো ট্রাম কার্ড চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ৫ম এবং ৬ষ্ঠ কার্ড দুটি (KQ) কারো কাছে একসাথে থাকা অবস্থায় দেখাতে পারলে তা ৪ পয়েন্ট (মেরিজ) হিসেবে বিবেচিত হয় (যদি তা ট্রাম কার্ড হয়)।

২৯ কার্ড গেম খেলতে কত জন খেলোয়াড় লাগে?

এই খেলাটি সাধারণত চারজনে খেলা হয়। তবে দুই জনেও এটি খেলা যায়। আজকে আমারা চারজন খেলোয়াড় নিয়ে কিভাবে এই গেমটি খেলতে হয় তা আলোচনা করব।

খেলা শুরু করার পূর্বে করণীয়ঃ

খেলার শুরুর পূর্বে চারজন খেলোয়াড় দুটি দলে বিভক্ত হবে এবং গোল হয়ে বসতে হবে। প্রত্যেক দলের দুজন খেলোয়ার পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে বসবে। হার্ট, ডায়মন্ড, স্পেড এবং ক্লাবস এর J 9 A K Q 10 8 7 কার্ড গুলো একসাথে করতে হবে মূল খেলার জন্যে। চারটি 6 কার্ডস্কোরিং এর জন্যে আলাদা করে রাখতে হবে। স্কোরিং এর জন্যে প্রত্যেক দল একটি লাল রং এবং একটি কালো রং এর 6 কার্ড পাবে। অবশিষ্ট ১৬ টি কার্ড একসাথে করে মাঝখানে স্তুপ আকারে রাখতে হবে ট্রাম্প কার্ড চিহ্নিত করার জন্যে।

২৯ কার্ড গেম খেলার সকল নিয়মঃ

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, ২৯ কার্ড গেম সাধারণত ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে চক্রাকারে চলে। খেলার নিয়মগুলো পয়েন্ট আকারে নিচে দেয়া হলোঃ

১. কার্ড সাফল করাঃ

খেলার শুরুতে  J 9 A K Q 10 8 7 কার্ড গুলো একসাথে করে উপুড় করে সাফল করতে হবে যেন কেউ কার্ড গুলো দেখতে না পায়। কার্ড সাফল করা এবং কার্ড বিতরণের কাজটি প্রত্যেকে চক্রাকারে করবে। প্রতিটি চক্র ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে চলবে।

২. কার্ড কাটাঃ

কার্ড সাফল করা হয়ে গেলে তার ডানপাশের খেলোয়ার কেটে দিবে। অর্থাৎ কার্ডগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে উপর নিচ করে দিবে। তবে কোন কার্ড দেখা বা দেখার চেষ্টা করা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

৩. কার্ড বিতরণঃ

সাফল করা এবং কাটা হয়ে হলে, সাফলকারী খেলোয়ার কার্ড বিতরণ করবে। প্রথমে ডান পাশের খেলোয়াড়কে চারটি কার্ড দিবে। কার্ড দেওয়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে অন্য কেউ যেন কার্ড দেখতে না পায়। এভাবে ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে বিতরণ করে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে চারটি করে কার্ড দিবে এবং সবশেষে নিজে চারটি কার্ড নিবে।

৪. বিট বা ডাকাডাকি বা কল কখন করবেন?

এভাবে চারটি করে মোট ১৬ টি কার্ড বিতরণ হওয়ার পর অবশিষ্ট ১৬ টি কার্ড উপুর করে রেখে দিতে হবে। খেলার এই পর্যায়ে বিট বা ডাকাডাকি বা কল করা শুরু হবে।  

৫. বিট বা ডাকাডাকি বা কল করার নিয়মঃ

২৯ কার্ড গেম এর মূল খেলায় ৩২ টি কার্ডে মোট ২৮ টি পয়েন্ট থাকে। এছাড়া ট্রাম কার্ডের KQ কারো কাছে একসাথে থাকা অবস্থায় দেখাতে পারলে তা ৪ পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ২৯ কার্ড গেমে মোট পয়েন্ট সংখ্যা ২৮+৪=৩২। বিট বা ডাকাডাকি করা হচ্ছে মূলত এই ৩২ পয়েন্ট থেকে কোন দল কত পয়েন্ট নিতে পারবে তা নিয়ে। বিট করার নিয়মগুলো নিচে দেয়া হলোঃ

  • বিট শুরু হবে সাফলকারী বা বিতরণকারী খেলোয়াড়ের ডানপাশ থেকে।
  • ১ম বিটকারী ১৬ থেকে বিট শুরু করবে, যদি সে বিট করতে না চায় তাহলে তার ডানপাশের খেলোয়ার বিট শুরু করবে।
  • আগের বিটকারী যত কল করবে পরবর্তী বিটকারী তার চেয়ে বেশি কল করতে হবে।
  • এভাবে প্রত্যেক খেলোয়াড় এমনকি নিজ দলের দুইজন খেলোয়াড়ও পরস্পরের সাথে বিট করার সুযোগ পাবে।
  • এভাবে সর্বোচ্চ বিটকারী খেলোয়াড় ট্রাম কার্ড নির্ধারণ করার সুযোগ পাবে।
  • যদি দুই জনের বিট বা কল সমান হয় তাহলে আগের বিটকারী ট্রাম করার সুযোগ পাবে।
  • কেউ বিট না করলে পুনরায় কার্ড সাফল করে বিতরণ করতে হবে।

৬. ট্রাম কার্ড চিহ্নিত করার নিয়মঃ

 বিট শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ বিটকারী খেলোয়াড় ট্রাম কার্ড নির্ধারণ করবে। ট্রাম কার্ড নির্ধারণের জন্যে খেলার শুরুতে আলাদা করে রাখা কার্ডগুলো হাতে নিয়ে যে কার্ডটি ট্রাম কার্ড হবে তা সবার নিচে উপুড় করে রেখে বাকী কার্ডগুলো তার উপর স্তুপ করে রাখতে হবে। ট্রাম কার্ড সম্পর্কে কাউকে কিছু বলা বা দেখানো অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

৭. অবশষ্ট কার্ড বিতরণঃ

ট্রাম কার্ড নির্ধারিত হয়ে গেলে মূল খেলার জন্যে নির্ধারিত অবশিষ্ট কার্ডগুলো পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করতে হবে।

৮. চাল শুরু করার নিয়মঃ

সাফলকারী বা কার্ড বিতরণকারী প্লেয়ারের ডানপাশ থেকে চাল শুরু হবে। প্রথম চাল দানকারী খেলোয়াড় সবার সামনে উলটো করে একটি কার্ড রাখবে। এরপর তার ডানপাশের খেলোয়াড় একই ধরণের একটি কার্ড রাখবে। এভাবে চক্রাকারে সবাই একই ধরণের একটি করে কার্ড রাখবে। চারটি কার্ডের মধ্যে যার কার্ডের মূল্যমান বা পয়েন্ট বেশি হবে সে সবগুলো কার্ড পাবে এবং পরের চাল শুরু করবে। এভাবে খেলা চলতে থাকবে।

৯. ট্রাম কার্ড দেখার নিয়মঃ

যদি কোন প্লেয়ারের কাছে একই রকমের কার্ড না থাকে তাহলে সে ট্রাম কার্ড দেখার সুযোগ পাবে এবং ট্রাম করার সুযোগ পাবে। এই অবস্থায় ট্রামকারী খেলোয়াড় সবগুলো কার্ড পাবে। তবে একাধিক খেলোয়ার ট্রাম করলে যার ট্রাম কার্ডের পয়েন্ট বা মূল্যমান বেশি হবে সে সবগুলো কার্ড পাবে।

১০. মেরিজ কার্ডঃ

ট্রাম কার্ড দেখার পর যদি দেখা যায় কারো কাছে ট্রাম কার্ডের KQ একসাথে আছে তাহলে তা দেখাতে হবে এবং তার দল মেরিজ কার্ডের চার পয়েন্টের সুবিধা পাবে।  

১১. পয়েন্ট হিসাব করার নিয়মঃ

এভাবে আটটি চক্র শেষ হওয়ার পর কারো হাতে খেলার মতো আর কোন কার্ড থাকবে না। এই অবস্থায় প্রত্যেক দল নিজেদের প্রাপ্ত কার্ডগুলো এক সাথে করে পয়েন্ট যোগ করবে। এক্ষেত্রে বিটকারী দল মেরিজ কার্ড পেয়ে থাকলে তারা চার পয়েন্ট যোগ করবে, তবে মূল খেলায় কমপক্ষে ১৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করতে হবে। যদি বিপক্ষ দল মেরিজ কার্ড পেয়ে থাকে তাহলে বিটকারী দলকে তাদের বিটের চেয়ে ৪ পয়েন্ট বেশি সংগ্রহ করতে হবে। হিসাব শেষে বিটকারী দল বিজয়ী হলে তাদের স্কোর লাল কার্ডে ১ হবে এবং পরাজিত হলে কালো কার্ডে ১ হবে। কালো এবং লাল কার্ড মুখোমুখি আড়াআড়ি করে স্কোর দেখানো হয়। একই ভাবে পরবর্তীতে ফলাফলের ভিত্তিতে স্কোর বাড়ানো বা কমানো হয়।  

১২. ডাবল, রিডাবল ও সেটঃ

বিট করার সময় যে দল ট্রাম করার সুযোগ পায় তার বিপরীত দল ডাবল দেওয়ার সুযোগ পায়। ডাবল দিলে স্কোর কার্ডে দ্বিগুন পরিবর্তন হবে। একই ভাবে যে দল ট্রাম কার্ড নির্ধারণ করে তারা রিডাবল নেয়ার সুযোগ পায়। এক্ষেত্রে স্কোর কার্ডে চারগুণ পরিবর্তন হবে। অপরদিকে কোন খেলোয়ার যদি সকল কার্ড জেতার মতো কার্ড পায় তাহলে সে সেট খেলতে পারে। এক্ষেত্রে ঐ খেলোয়াড় বিপক্ষ দলের দুই জনের বিপক্ষে একা খেলবে এবং তার দলের অপর খেলোয়াড় বসে থাকবে। সেট জিতলে স্কোর কার্ডে ৩ গুন পরিবর্তন হবে। তবে অনেক জায়গায় এই নিয়মের ব্যতিক্রমও খেলা হয়। খেলা শুরুর পূর্বে এ বিষয়ে কথা বলে নেয়া ভালো।

১৩. খেলার ফলাফলঃ

যে কোন দল যদি নিজেদের স্কোর কার্ডে লাল রং এর স্কোর ৬ করতে পারে অথবা প্রতিপক্ষের স্কোর কার্ডে কালো রং এর স্কোর ৬ করাতে পারে তাহলে তারা বিজয়ী হবে। এভাবেই ২৯ কার্ড গেমের একটি খেলা সমাপ্ত হবে।   

শেষকথাঃ

আমার জানা ২৯ কার্ড গেম খেলার সবগুলো নিয়ম এখানে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। কোন নিয়ম বাদ পড়লে কমেন্ট সেকশনে জানাবেন এবং আমি সে অনুযায়ী আপডেট করার চেষ্টা করব। সবশেষে একটা অনুরোধ- আপনারা কেউ বাজি ধরে খেলবেন না বা কার্ড দিয়ে জুয়া খেলবেন না। সবাই খেলাটা শিখুন এবং অবসর সময়টা আনন্দে কাটান। ধন্যবাদ!


Leave a Reply

Close Menu