মোনালিসা ছবির অজানা রহস্য

মোনালিসা ছবির অজানা রহস্য

পৃথিবীতে খুব কম মানুষই আছেন যারা মৃত্যুর পরও তাদের কর্মের জন্যে অমর হয়ে আছেন। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এমনই একজন। তাকে আমরা অনেকেই মোনালিসা ছবির জন্যে একজন চিত্রশিল্পী হিসেবেই জানি। কিন্তু তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পই ছিলেন না বরং একই সাথে একজন দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। অনেক থিউরিস্ট মনে করেন যে, তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাক্তি।

লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি ১৫ই এপ্রিল ১৪৫২ সালে ইতালির ভিঞ্চি নামক শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। মোনালিসা ছবিটি তার একটি অমর সৃষ্টি, যা আজও আমাদের কাছে নিরন্তর রহস্য সৃষ্টি করে চলছে। আজকে আমরা লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মোনালিসা ছবির কিছু অজানা রহস্য নিয়ে আলোচনা করব।

আসলে এই চিত্রটির নাম মোনালিসা (Monalisa) নয়। এটি একটি উচ্চারণগত ভূল। এটি আসলে মনা লিসা (Mona Lisa)। ইতালিতে মনা লিসা শব্দের অর্থ মাই লেডি। মোনালিসা ছিল দ্যা ভিঞ্চির সবচেয়ে প্রিয় চিত্র। তিনি যেখানেই যেতেন মোনালিসা চিত্রটি সঙ্গে নিয়ে যেতেন।

১৭৫৭ সালে মোনালিসা চিত্রটি প্রথম ফ্রান্সের প্যারিসের লুভর মিউজিয়ামে খুজে পাওয়া যায়। কিন্তু কেউই জানে না যে, এই চিত্রটি কোথা থেকে কিভাবে এখানে এসেছিল। ২১ শে আগস্ট ১৯১১ সালে এই চিত্রটি মিউজিয়াম থেকে চুরি হয়ে যায়। কিন্তু ১০ বছর পর তা আবার খুজে পাওয়া যায়।

১৯৫১ সালে এক ব্যাক্তি এই ছবিটিতে একটি পাথর ছুড়ে মারে। যার ফলে মোনালিসার বাম হাতের কুনুইয়ের দিকে একটি দাগ হয়ে যায়। এরপর লুভর মিউজিয়ামে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ কক্ষ নির্মান করা হয়। কক্ষের তাপমাত্রা এমনভাবে রাখা হয়েছে যেন মোনালিসার চিত্রটি খারাপ না হয়ে যায়। এই কক্ষটি বানানোর জন্যে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রায় ৫০ কোটি টাকা খরচ করে। মোনালিসার চিত্রটি একটি বুলেট প্রতিরোধে সক্ষম কাচের মধ্যে রাখা হয়েছে।

১৪ই ডিসেম্বর ১৯৬২ তে এই চিত্রটির মূল্য ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার বা ৬৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে এই চিত্রটির মূল্য হলো ৭৯০ মিলিয়ন ডলার বা ৫৩৮০ কোটি টাকা।

এখন তাহলে আসা যাক কি রহস্য লুকিয়ে আছে মোনালিসার এই ছবিতে?

মোনালিসা কে ছিলেন?

লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি কখনোই প্রকাশ করেননি যে এই ছবিটিতে যে মহিলা আছেন তিনি আসলে কে। তার লেখা গ্রন্থগুলিতে মোনালিসা সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেননি। অনেকে মনে করেন যে, এই ছবিটি বানানোর সময় তিনি মাদার মেরীর কথা স্বরণ করেছিলেন।

অনেকে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে মোনালিসা ছবিতে লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি নিজেকেই একটি বিমূর্ত নারী চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে মোনালিসা ফ্রান্সেসকো দেল জিয়াকন্ডো নামে এক ফ্রলোরেনটাইন রেশম ব্যাবসায়ীর স্ত্রী লিসা। লা জিয়াকন্ডো ইতালিতে লিসা নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।

১৫০৩ সালের একটি চিঠি যা পরবর্তীতে ২০০৫ সালে আবিস্কৃত হয়, সেখানে লিউনার্দোর এর বন্ধু তার স্ত্রী লিসার ছবি আঁকার জন্যে তাকে অনুরোধ করেন। উল্লেখ্য যে মোনালিসা ছবিটি ১৫০৩ সালেই আঁকা শুরু হয় এবং তা ১৫১৯ সাল পর্যন্ত চলে। অর্থাৎ লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই চিত্রটি বানিয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রটি শেষ করার আগেই দ্যা ভিঞ্চি মৃত্যু বরণ করেন।

এই দীর্ঘ সময় কাজ করার জন্যে ছবিটির প্রকৃত মুখটি কিছুটা ঝাপসা হয়ে জীবন্ত এক বিমূর্ত রূপ ধারণ করে,  যা তখনকার সময় একটি উজ্জ্বল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে দেখানো হত এবং এর জন্যে লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি প্রসংশিত হয়েছিলেন। তবে এটি নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয় যে, চিত্রটি লিসা জিয়াকন্ডোরই।

মোনালিসা চিত্রের উপকরণ কি ছিল?

মোনালিসা চিত্রটি কোন কাগজ বা কাপড়ের উপর আঁকা হয়নি। বরং এটি আঁকা হয়েছে কাঠের উপর, যা আমরা ব্যবহার করি স্কেটবোর্ড বানানোর জন্যে।

২০০৫ সালে পাস্কেল কটে স্পেক্ট্রোলাইট টেকনলজি ব্যবহার করে মাল্টি ল্যান্স ক্যেমেরার সাহায্যে মোনালিসা চিত্রের বিভিন্ন স্তরের ছবি তোলেন এবং বিস্ময়কর সব তথ্য দেন। তিনি দেখান যে, এই চিত্র যে রং দিয়ে আঁকা হয়েছে তার গভিরতা মাত্র ৪০ মাইক্রো মিটার। তার অর্থ হচ্ছে এটি একটি সরু চুলের চেয়েও পাতলা।

এই চিত্রটির মধ্যে আরোও তিনটি চিত্র আছে। যা মোনালিসা চিত্রটির মধ্যে লুকিয়ে আছে। তবে অবাক করা বিষয় হলো সেই চিত্রে লিসা জিয়াকন্ডোর চিত্রের অনেকাংশে মিল পাওয়া যায়। ভিঞ্চি হয়ত লিসা জিয়াকন্ডোর চিত্রই বানিয়েছিলেন। কিন্তু লিসা জিয়াকন্ডের মুখ হয়ত তার বেশি একটা পছন্দ হয়নি। তাই হয়ত এই চিত্রটিকে আরো মডিফাই করে মোনালিসা চিত্রটি তৈরী করেন।

ছবির ভিতরে লুকোনো স্বাক্ষর

২০১০ সালে, ইতালির ন্যাশনাল কমিটি ফর কালচারাল হেরিটেজের চেয়ারম্যান সিলভানো ভিনসেটি দাবি করেন যে মোনা লিসার চোখের উপর অত্যন্ত ছোট করে আঁকা অক্ষর রয়েছে: এল এবং ভি (লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আদ্যক্ষর) ডান চোখে এবং সম্ভবত সি, ই অথবা বি বাম চোখে। অবশ্য লুভর মিউজিয়াম কতৃপক্ষ প্রতিক্রিয়ায় জানায় যে অক্ষরগুলো কেবল ছবিটির মাইক্রোস্কোপিক ফাটল ছিল।

মোনালিসার পরিবর্তনশীল হাসি

বলা হয়ে থাকে মোনালিসার ছবিটিকে আলাদা আলাদা এঙ্গেল থেকে দেখলে মোনালিসার হাসি পরিবর্তিত হয়। শুধু হাসি নয়, ছবিটিকে বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে দেখলে কিছুটা ভিন্ন মনে হয়। এটি সত্যিই লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চির এর রহস্যময় সৃষ্টি।

সান্ডারলাইট ইউনিভার্সিটি তাদের সদস্যদের নিয়ে একবার মোনালিসা চিত্রটির সার্ভে করেছিলেন। সেখানে দেখা যায় যে দূর থেকে দেখলে যেমন মনে হয় মোনালিসা হাসছে আবার কাছ থেকে দেখলে মোনালিসার ঠোট দুটো নিচের দিকে ঝুঁকে আছে, যার ফলে মনে হয় মোনালিসা চিন্তায় মগ্ন আছে।

লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি চিত্রটি বানানোর সময় কিছু কৌশল ব্যবহার করেন, যাতে কোন আউটলাইন থাকে না। আর কোন আউটলাইন থাকলেও তা রং দিয়ে চাপা দিয়ে দেওয়া হয়। আজ পর্যন্ত কোন মানুষ এই কৌশল এতো ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারেনি যতটা ভিঞ্চি করেছিলেন।

তবে মোনালিসার হাসি বদলে যাওয়ার এটিই মূল কারণ নয়। আসল কারণ লুকিয়ে আছে মোনালিসার চোখে। আমরা যখন মোনালিসার চোখের দিকে তাকাই তখন তা একটি হাসি খুশি নারীর চোখ। আবার যখন তার ঠোটের দিকে তাকাই তখন সেই হাসি মিলিয়ে যায়।

মোনালিসা চিত্রের গোপন বার্তা

মোনালিসার চিত্রের মাঝে একটি গোপন বার্তাও দেওয়া আছে। কিভাবে চিত্রের মধ্যেও গোপন বার্তা দেওয়া যায়? মোনালিসা চিত্রের হাতের বাম পাশে সেই বার্তা দেওয়া আছে। যখন আল্ট্রা হাই লাইট পদ্ধতিতে ছবিটি খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল তখন সেখানে কিছু অক্ষর পাওয়া যায়। এই অক্ষর গুলোকে পরপর সাজালে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে ‘La Risposta Si Trova Qui’. শব্দ গুলো ইতালিয়ান ভাষায় লেখা যার অর্থ হলো ‘The answer is here’. অর্থাৎ আমরা সেই জায়গার সন্ধান পেয়ে গেছি যেখানে এতোদিন এই চিত্রটির সব রহস্য লুকিয়েছিল।

এই রহস্য উন্মোচনের জন্যে অনেকেই চেষ্টা চালিয়েছিল কিন্তু কেউ কিছু খুজে পায়নি। সম্প্রতি এক প্যারানরমাল ওয়েবসাইট দাবি করে যে মোনালিসার চিত্রে এলিয়েন লুকিয়ে রয়েছে। শুনলে অবাক লাগলেও যদি আমরা মোনালিসার ছবির বাম দিকে একটি আয়না বসাই তখন আমরা একটি এলিয়েনের চেহারা দেখতে পাব। এটি শুনতে ইন্টারেস্টিং মনে হলেও আমরা এই চেহারাটি সেখানেই দেখতে পাই যেখানে দ্যা ভিঞ্চি উত্তর লুকিয়ে আছে বলে উল্লেখ করেছেন। মোনালিসা চিত্রটি কি তাহলে কোনভাবে এলিয়েন রহস্যের সাথে একাকার হয়ে আছে?

Leave a Reply

Close Menu