মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর নক্ষত্র

মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর নক্ষত্র

আমাদের এই মহাবিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে ভয়ংকর সব বস্তু। আমরা যখনই মহাবিশ্বের কথা চিন্তা করি তখন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ব্ল্যাক হোল, ওয়ার্ম হোল ইত্যাদি আমাদের মাথায় চলে আসে। কিন্তু আমরা কি কখনো চিন্তা করি যে, এগুলোর মধ্যে  কোনটি আমাদের জন্যে কতটুকু ভয়ংকর হতে পারে?

ওরায়েন তারা মন্ডলে একটি তারা বর্তমানে খুবই ভয়ংকর অবস্থায় আছে, যার নাম হচ্ছে বিটেলজুস। এটা একটা রেড জায়ান্ট সুপার স্টার। তারাটি এই কারণে ভয়ংকর যে, এটি বর্তমানে তার মৃত্যুর দিকে এগিয়ে আসছে। এটি এমন এক অবস্থায় আছে, যে কোন সময় এর মৃত্যু ঘটতে পারে। যদিও পৃথিবী থেকে এই তারাটির দূরত্ব ৬৪০ আলোকবর্ষ। এই তারাটি আকারে এতো বড় যে, যদি এই তারাটিকে আমাদের সৌরমন্ডলে সূর্যের জায়গায় বসাই, তাহলে এর পরিধি বৃহস্পতি পর্যন্ত পৌছে যাবে।

বিটলজুস আমাদের জন্যে ভয়ংকর কেন?

বিটলজুসের মত বড় বড় তারার যখন মৃত্যু হয় তখন অত্যন্ত ভয়ংকর একটি বিস্ফোরণ হয়। বিজ্ঞানিরা ধারণা করছেন যে, বিটলজুসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে চলেছে। বিজ্ঞানিরা এটাও ধারণা করছেন যে, বিটলজুসের যখন মৃত্যু ঘটবে তখন এর থেকে একটি ভয়ানক সুপারনোভা তৈরী হতে পারে। এ সময় কয়েক মিনিটে যে পরিমান শক্তির বিকিরণ ঘটবে তা আমাদের সূর্যের ১০ বিলিয়ন বছরে তৈরী করা শক্তির সমান হবে।

এই শক্তি তাপ, আলো এবং উত্তপ্ত গ্যাসের আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং প্রতি সেকেন্ডে কয়েক হাজার মাইল দূরত্ব অতিক্রম করবে। এ সময় এই শক ওয়েবের রাস্তায় যা কিছু পড়বে সবকিছুই ধংস হয়ে যাবে। এ ধরণের বিস্ফোরণ যদি পৃথিবীর কাছাকাছি কোথাও হয় তাহলে পৃথিবী থকে প্রাণের অস্তিত্ব চিরদিনের জন্যে শেষ হয়ে যেতে পারে।

যদি এই ধরণের তারা আমাদের থেকে ৩০ আলোকবর্ষ দূরেও থাকে তাহলে তাও আমাদের জন্যে বিপদজনক হবে। তবে বর্তমানে আমরা বিটলজুস থেকে সুরক্ষিত আছি, কারণ আমরা তার থেকে ৬৪০ আলোকবর্ষ দূরে আছি। তাই আগামী কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যে এই সুপারনোভা তৈরী হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই।

নিউট্রন স্টার মহাবিশ্বের আরেক ভয়ংকর দানব!

মহাবিশ্বে নক্ষত্রের এমন ভয়ানক আচরণ তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানে নতুন কিছু নয়। দুটি নিউট্রন স্টারের মধ্যে যদি সংঘর্ষ হয় তাহলে যে বিস্ফোরণ হবে, তা বিশালতার দিক থেকে বিগব্যাং এর পরেই স্থান করে নিবে।

নিউট্রন স্টার হচ্ছে একটি জায়ান্ট তারার মৃতদেহ যার মধ্যে এখনো একটু প্রাণ বাকি আছে। এর আকৃতি অনেক ছোট হলেও ভর অনেক বেশি। একটি ছোট খাটো পাথরের সমান নিউট্রন স্টারের ভর হিমালয় পর্বতের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। স্বাভাবিক ভাবেই এর মহাকর্ষ বল অত্যাধিক বেশি হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

পদার্থের ঘনত্বের দিক থকে চিন্তা করলে ব্ল্যাক হোলের পরই নিউট্রন স্টারের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞানিরা মনে করেন একটি নিউট্রন স্টারের মহাকর্ষ বল আমাদের পৃথিবীর তুলনায় ২০০ বিলিয়ন গুন বেশি। আমরা যদি কোনভাবে একটি নিউট্রন স্টারের কাছাকাছি পৌছে যাই তাহলে এটি আমাদেরকে প্রায় আলোর অর্ধেক গতিতে নিজের দিকে টানতে থাকবে।

২০১৩ সালের জুন মাসে নাসার একটি স্যাটেলাইট লক্ষ্য করে যে, আমাদের কাছের একটি গ্যালাক্সিতে একটি ভয়ানক বিস্ফোরণ। যা একটি গ্যালাক্সিতে হওয়া একটি বড় ধরণের ঘটনার সাক্ষী দিচ্ছিলো। পরে বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা যায় যে, এটি মূলত দুটি নিউট্রন স্টারের একসঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ফলে এই বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়েছিল।

ডাবল স্টার সিস্টেমের দুটি তারা যখন একে অপরের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ঘুরতে থাকে তখন তারা পরস্পরের সাথে ধাক্কা খেতে পারে। এই ধরণের বিস্ফোরণগুলোকে বিগব্যাং এর পরে মহাবিশ্বে হওয়া সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ গুলোর তালিকায় রাখা হয়।

এই ধরণের বিস্ফোরণের ফলে শুধু শক্তিই উৎপন্ন হয় না। এর ফলে এক ধরণের স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার এর জন্ম হয় যা এই মহাবিশ্বের সবকিছুকেই খেয়ে নিতে পারে। এই স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার যে কোন বস্তুর সংস্পর্শে আসলে তাও স্ট্রেঞ্জ ম্যাটারে রুপান্তরিত হয়ে যায়। এটি একটি চেইন রিয়েকশনের মতো ঘটনা।

এই স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার গুলো স্বাভাবিকভাবে আমাদের আশেপাশে দেখা যায় না। এর কারণ বুঝতে হলে একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন হবে। এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবকিছুই ইলেক্ট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন দ্বারা গঠিত। এই ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রনগুলো গুলো আবার কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। এই কোয়ার্ক আবার ৬ ধরণের হতে পারে, আপ, ডাউন, স্ট্রেঞ্জ, চার্ম, টপ, বটম।

এর মধ্যে আপ এবং ডাউন কোয়ার্ক সবচেয়ে সাধারণ হয়, যা দিয়ে আমাদের আশেপাশের সকল বস্তু তৈরী হয়েছে। একইভাবে স্টেঞ্জ ম্যাটারগুলো অন্য ধরণের একটি কোয়ার্ক, স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। এই স্ট্রেঞ্জ ম্যাটারগুলো মহাবিশ্বের বড় বড় বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরী হতে পারে। দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষের ফলে যা চাপের সৃষ্টি হয় তা এই স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার তৈরীর জন্যে যথেষ্ট।

স্ট্রেঞ্জ ম্যাটারগুলো আবার দুধরণের হতে পারে। প্রথমত ধনাত্বক চার্জ যুক্ত স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার এবং দ্বিতীয়ত ঋনাত্বক চার্জ যুক্ত স্ট্রেঞ্জ ম্যাটার। এই ঋনাত্বক চার্জ যুক্ত স্ট্রেঞ্জ ম্যাটারগুলো যে সকল বস্তুর সংস্পর্ষে যায় তাকেই স্ট্রেঞ্জ ম্যাটারে রুপান্তর করে দেয় যা ছড়িয়ে পড়ে মহাবিশ্বের অসীম সীমানায়, আর শুরু হয় ভয়ংকর চেইন রিয়েকশনের।  

মহাবিশ্বের এই সব ভয়ংকর আর দানবীয় ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তবে এগুলো ঘটে চলেছে মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও। এগুলো আমাদের চিন্তার সীমানাকে যেমন অতিক্রম করতে পারে, ঠিক তেমনি কল্পবিজ্ঞানের কাহিনীকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে অনায়াসেই।

Leave a Reply

Close Menu