পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ার চেনার উপায়!

পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ার চেনার উপায়!

ষ্টক মার্কেট বা পুঁজিবাজারে মুনাফা করতে হলে ভালো শেয়ার চেনার উপায় জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যারা ভালো শেয়ার বাছাই করতে জানেন তাদের জন্যে বাজার ভালো খারাপে কিছু যায় আসে না। মন্দা বাজারেও তারা ঠিকই মুনাফা বের করে নিতে পারেন। তাই প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর জন্যে পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ার চেনার উপায় জানা আবশ্যক।  

আমাদের দেশে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীরই পুঁজিবাজার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। ফলে তারা মূলধন হারিয়ে নিঃশ্ব হচ্ছেন। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সব সময়ই এক ধরণের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করে।  এর মধ্যে আবার অনেকেই গুজবের পেছনে ছুটেন। আবার কেউ কেউ খুজেন কোথায় ভালো গেম হবে। অনেকে বেশি লাভের আশায় টাকার বিনিময়ে আইটেম কিনেন। এই সুযোগে আরেকদল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আইটেম বিক্রি করে ব্যবসা করছে। যার কোনটাই আসলে শেয়ার বাজারের মূল ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত নয়। তারা শেয়ার কি সেটাই বুঝে না। পুঁজিবাজার মূলত বিনিয়োগের জায়গা। যা দীর্ঘ মেয়াদী। কিন্তু অনেকেই এটাকে প্রতিদিনের লাভের বাজার মনে করে। তারাই বেশিরভাগ সময় লুজার হচ্ছেন।

যেসব বিষয় দেখতে হবে!

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে বেশকিছু বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে ফান্ডামেন্টাল এবং টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস। ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিসের মধ্যে কোম্পানির মৌলভিত্তির ধারণা মিলবে। আর টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসে কোম্পানির শেয়ারের মুভমেন্ট বলে দেবে। এভাবে বিশ্লেষণ করে বাজারের ভালো শেয়ার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে।

নিট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV)

ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের বেশকিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যার মধ্যে বিনিয়োগের জন্য প্রথমত শেয়ারের সম্পদ মূল্য দেখতে হবে। সংক্ষেপে বলা হয়, নিট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) বা প্রকৃত সম্পদ মূল্য। ভালো শেয়ার সম্পদ মূল্য বেশি থাকে।

NAV এর সাথে বাজার মূল্যের সামঞ্জস্য থাকা উচিত। সাধারনত NAV ও শেয়ারের মূল্য অনুপান ১ হলে তা বিনিয়োগের জন্য আদর্শ বলে বিবেচিত হয়। তবে আমাদের বাজারে এ অনুপাত ১.৫ থেকে ২ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। মানে ৫০ টাকা NAV হলে ঐ শেয়ারের জন্য ১০০ টাকা পর্যন্ত ক্রয় মূল্য নিরাপদ।

শেয়ারের মূল্য ও আয়ের অনুপাত (P/E Ratio)

একটি কোম্পানি প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে কী পরিমাণ আয় করছে, বিনিয়োগের জন্য তা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। শেয়ারের মূল্য ও আয়ের অনুপাত (P/E Ratio) বা কোম্পানির শেয়ারপ্রতি বাজারমূল্য এবং শেয়ারপ্রতি আয় অনুপাত বাজারের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। এ অনুপাত যত কম, শেয়ার তত ঝুঁকিমুক্ত।

লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের অন্যতম আরেক মাপকাঠি হল কোম্পানির লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড। এ লভ্যাংশ কখনও নগদ বা বোনাস শেয়ার হতে পারে। তবে ভালো কোম্পানিগুলো নগদ লভ্যাংশ বেশি দেয়।

এ ছাড়া রয়েছে কোম্পানির বুক ভ্যালু ও প্রবৃদ্ধির হার। অন্যদিকে কোম্পানির উদ্যোক্তা হিসেবে কারা রয়েছে, তাদের পেছনের রেকর্ড অবশ্যই বিনিয়োগের জন্য বিবেচনায় নিতে হবে।

বিনিয়োগকারীরা কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকির মাত্রা কম থাকবে সেটি কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণ করে জানতে হবে। এর মধ্যে কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল এবং টেকনিক্যাল এনালাইসিস করতে হবে। কোন কোম্পানি আর্থিকভাবে কত বেশি শক্তিশালী তা কোম্পানির মৌলভিত্তি দিয়ে জানা যাবে।

যে কোম্পানির শেয়ার কেনা হবে, তার বর্তমান আয়, বার্ষিক আয়, কোম্পানি নতুন কোনো পরিবর্তন আসছে কিনা, কোম্পানির পণ্য সরবরাহ কেমন, নেতৃত্বে কারা আছে, কোম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কেমন এবং সবশেষে ওই কোম্পানির পণ্যের বাজারে চাহিদা কেমন আছে।

যিনি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী তার প্রথম কাজ হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক বিবরণ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেয়া। প্রতিটি কোম্পানি প্রতি বছর বার্ষিক আয় -ব্যয় সংবলিত একটি প্রতিবেদন পেশ করে। ওই প্রতিবেদন সংগ্রহ করে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে।

সামগ্রিক বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের জানাতে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSC) থেকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এখানে শেয়ারবাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীদের করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যে কোনো বিনিয়োগকারী এতে অংশ নিতে পারেন।

শেয়ার বিক্রি করে নয়; বরং কেনার সময়ই আপনাকে লাভ করতে হবে। কম দামে ভাল শেয়ার কিনতে না পারলে বিক্রি করে লাভ করা সম্ভব নয়। ব্যাক্তিগতভাবে ‘ডাউন মার্কেট ই হল আমার প্রিয় বিনিয়োগের সময়। কারণ, এ সময় ভাল মানের শেয়ার তুনামূলকভাবে অনেক কম দামে কেনার সুযোগ পাওয়া যায়।

কিভাবে কিনবেন?

মনে করুন আপনি কোন একটি কোম্পানির ১০০০ টি শেয়ার কিনতে চান। সাধারণত আমরা একবারেই সব শেয়ার কিনে ফেলি। আর এতে আমাদের লোকসানের ঝুঁকি অনেক অনেক বেড়ে যায়। বরং একবারে সব শেয়ার না কিনে ৩-৪ বারে কিনুন। এটা মাথায় রাখুন যে, আপনি কেনার পর পরই শেয়ারটির দাম পড়ে যেতে পারে।

তাই ৩/৪ বারে কিনলে আপনার গড় ক্রয় মূল্য অন্যদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই কম হবে। অর্থাৎ শুরুতেই আপনি অন্যদের চাইতে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকবেন; যা আপনার মুনাফা অর্জনের জন্য সহায়ক। এ স্ট্রটেজিকে বলা হয় এভারেজিং টেকনিক। বিক্রির ক্ষেত্রেও একই ফরমূলা অনুসরণ করুন। সব শেয়ার একবারে বিক্রি না করে ২-৩ ধাপে বিক্রি করুন।

কি পরিমাণ কিনবেন?

এটা নির্ভর করে আপনার পোর্টফলিও এর ডিজাইন ও তার বর্তমান অবস্থার ওপর। সহজ কথায়, সব মূলধন একটি কোম্পানির স্টকে বিনিয়োগ নিরাপদ নয়। এ কারনে সব টাকা একটি সেক্টরের ৩/৪ টি শেয়ার বিনিয়োগ করাও অনুচিত। নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য প্রথমেই ২-৩ টি সেক্টর বাছাই করুন। এবার প্রতিটি সেক্টর থেকে ২-৪ টি কম্পানির শেয়ার আপনার পোর্টফলিওতে রাখুন।

কারন সব ডিম এক খাচায় রাখলে একটি দুর্ঘটনাই আপনার সব কিছু নষ্ট করে দিতে পারে। তাই কখনই সব মূলধন একটি শেয়ারে বা একটি সেক্টরের শেয়ার সমূহে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকুন।

আশা করি পাঠকগণ মৌলিক বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছেন। লেখাটি আপনার সামান্যতম উপকারে আসলে এবং তা অন্যদেরও জানা প্রয়োজন মনে করলে বন্ধুদের সাথে অবশ্যই শেয়ার করবেন। লেখার ভূল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাইকে ধন্যবাদ!  


লেখকের অন্যান্য লেখাসমূহঃ

জীবনে ভিন্ন কিছু করার উপায়

২৯ কার্ড গেম খেলার নিয়ম

বিখ্যাত মনিষীদের উক্তি – শ্রেষ্ঠ বানী চিরন্তন

দাবা খেলার নিয়ম কানুন ও সূত্র

Leave a Reply

Close Menu