বৃহস্পতি গ্রহের জানা অজানা কথা

বৃহস্পতি গ্রহের জানা অজানা কথা

আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ হচ্ছে বৃহস্পতি। সৌরজগতের সবগুলো গ্রহের ভরকে একসাথে যোগ করলেও তার তুলনায় বৃহস্পতির ভর আড়াই গুন বেশি হবে। অবস্থানের দিক থেকে এই গ্রহটি পঞ্চম হলেও পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যায়। পৃথিবী থেকে উজ্জলতার দিক দিয়ে শুক্র গ্রহ এবং মঙ্গল গ্রহের পরেই এর অবস্থান।

নিরক্ষরেখা বরাবর এর পরিধি ১,৪২,৯৮৪ কিলোমিটার। বিশাল আয়তন এবং উজ্জলতার কারণে কোন টেলিস্কোপ ছাড়াই এই গ্রহকে খালি চোখে দেখা যায়। অন্যান্য গ্রহের তুলনায় বৃহস্পতির দিন রাতের দৈর্ঘ্য অনেক কম। যেমন পৃথিবী নিজ অক্ষ বরাবর একবার ঘুরতে সময় নেয় প্রায় ২৪ ঘন্টা, আর বৃহস্পতি সময় নেয় মাত্র ৯ ঘন্টা ৫৫ মিনিট, যা অন্য যে কোন গ্রহ থেকে অনেক কম।

বৃহস্পতি সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ৪,২২৯ দিন, যা পৃথিবীর হিসাবে ১১.৮৬ বছরের সমান। এতো বেশি সময় নেয়ার কারণ হলো সূর্য থেকে এর দূরত্ব। সূর্য থকে বৃহস্পতির গড় দূরত্ব প্রায় ৭৭.৮ কোটি কিলোমিটার।

বৃহস্পতি গ্রহটির গঠন মূলত গ্যাস দিয়ে হয়েছে। সেই কারণে এই গ্রহের ঘনত্ব অনেক কম। প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে এর ভর মাত্র ১.৩২৬ গ্রাম। গ্রহটি পুরোপুরি মেঘ দ্বারা ঢাকা। এর বায়ূমন্ডল গঠিত হয়েছে ৮৯ শতাংশ হাইড্রোজেন, ১০ শতাংশ হিলিয়াম এবং ১ শতাংশ অন্যান্য গ্যাস দ্বারা।

মেঘের নিচের স্তরের ঘনত্ব কিছুটা বেশি। ধারণা করা হয়, পুরোপুরি কঠিন পদার্থের অস্তিত্ব বৃহস্পতিতে নেই। এর বায়ূমন্ডল মেঘের অনেকগুলো স্তর দিয়ে গঠিত। এই গ্রহের কেন্দ্র বা কোর খুবই ছোট, আর তার উপর এক বিশাল গ্যাসের স্তর রয়েছে। এই গ্যাসের মধ্যে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছাড়াও কম পরিমাণে মিথেন, অ্যমোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড রয়েছে। এই গ্যাসগুলোই মিলিতভাবে বৃহস্পতিকে বর্ণিল করে রেখেছে, একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

এই গ্রহের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং বিশিষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই গ্রহের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত দ্যা গ্রেট রেড স্পট। বিজ্ঞানিরা মনে করেন এটা একটা বিশাল আকারের দৈত্যাকার ঝড়। এই ঝড় সপ্তদশ শতাব্দি থেকে এক টানা বয়ে চলেছে বলে ধারণা করা হয়। ঝড়টির আকার এতো বড যে, এর ভিতরে দুটো আস্ত পৃথিবী সহজেই ঢুকে যাবে। এই ঝড় ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। এই রেড স্পট আজো আমাদের কাছে এক রহস্যের বিষয়।

বৃহস্পতি মূলত একটি ঠান্ডা গ্রহ, যেখানে মেঘের তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে ১৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস হয়। এর কারণ হলো সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহের অবস্থান অনেক দূরে। অন্যদিকে বৃহস্পতির কেন্দ্রের তাপমাত্রা খুব বেশি। এর কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ২৪,০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের তুলনায় বৃহস্পতির মধ্যাকর্ষন শক্তি সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীর তুলনায় এর মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রায় আড়াই গুন বেশি। বৃহস্পতি গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রও অন্যান্য গ্রহের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। এই গ্রহের ম্যাগনেটিক ফিল্ড পৃথিবীর তুলনায় প্রায় চৌদ্দ গুণ বেশি শক্তিশালী।

বৃহস্পতি গ্রহের ভর পৃথিবীর তুলনায় ৩১৮ গুন বেশি। আর আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে ভারী গ্রহ হচ্ছে বৃহস্পতি। আকারের দিক দিয়ে যদি আমাদের পৃথিবীর সাথে তুলনা করি তাহলে ১১ টি পৃথিবীর সমান গ্রহ লাইন দিয়ে রাখার পর তা বৃহস্পতির পরিধির সমান হবে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, বৃহস্পতিকে আকারের দিক থেকে সূর্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে যে, এটি সূর্যের চেয়ে এতো ছোট যে এক হাজার বৃহস্পতি গ্রহকে অনায়াসে সূর্যের ভিতরে রাখা যাবে। বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহের সংখ্যা ৬৭ টি। সংখ্যাটি ভবিষ্যতে আরোও বাড়তে পারে। এদের মধ্যে চারটি উপগ্রহ বৃহৎ আকৃতির। এদেরকে গ্যালিলিও উপগ্রহ বলা হয়। কারণ গ্যালিলিও প্রথম এই চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন। এদের মধ্যে একটি হচ্ছে গ্যানিমেড।

বৃহস্পতির সবচেয়ে বড় উপগ্রহ হচ্ছে গ্যানিমেড, যার ব্যাস ৫,২৬৮ কিলোমিটার। যা আমাদের চাঁদের প্রায় দ্বিগুন এবং বুধ গ্রহের চেয়েও আকারে বড়। যদি গ্যানিমেড বৃহস্পতির চারদিকে না ঘুরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করত, তাহলে একে সহজেই গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হতো।

বৃহস্পতি গ্রহের জানা অজানা তথ্যগুলো কেমন লাগলো তা অবশ্যই আমাদেরকে কমেন্ট করে জানাবেন

Leave a Reply

Close Menu