বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য ও সমাধান

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য ও সমাধান

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় স্থানগুলোর মধ্যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল অন্যতম। এই অঞ্চলটি ডেভিল ট্রায়াঙ্গেল বা শয়তানের ত্রিভূজ নামেও পরিচিত। বলা হয়ে থাকে এই অঞ্চলের উপর দিয়ে কোন জাহাজ বা প্লেন গেলে তা আর ফিরে আসে না। এই অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো জন্ম দিয়েছে বিভিন্ন রহস্য ও কল্পকথার। অনেকে একে সংযুক্ত করেছে এলিয়েন রহস্যের সাথে। অনেকে ওয়ার্ম হোলের অস্তিত্বের কথা তুলে এনেছেন আবার অনেকে হায়ার ডাইমেনশনের কথা উল্লেখ করেছেন, যার কোনটাই আসলে সঠিক নয়। এখানে আমরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের মূল রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করব। আশা করি শেষ পর্যন্ত পড়ার চেষ্টা করবেন।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল কি?

আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিমাংশে বারমুডা, ফ্লোরিডা ও পোরতরিকো এর মাঝামাঝি একটি স্থান হচ্ছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল কি?

এই স্থানটিকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল প্রথম বলেছিলেন লেখক ভিনসেন্ট গেডিস। তিনি তার “দ্যা ডেডলি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল” নামক আর্টিকেল এ এই অঞ্চলকে একটি রহস্যজনক স্থান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং পরবর্তীতে তার লেখা বই “ইনভিজিবল হরিজনস” এ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল কিভাবে ডেভিলস ট্রায়াঙ্গেল হলো?

১৯৪৫ সালের ৫ই ডিসেম্বর ফ্লোরিডা ক্যাম্প থেকে ১৪ জন নেভি এয়ার ম্যান প্রতিদিনের মতো সেদিনও রোটিন প্র্যাকটিস এ বের হয়। প্রায় দেড় ঘন্টা পর ফ্লাইট লিডার চার্লস টেইলর কন্ট্রোল রুমকে জানায় তাদের সাথে খারাপ কিছু হচ্ছে। তাদের তিনটি কম্পাসই ঠিকভাবে দিক নির্দেশ করছে না। তারা পশ্চিমদিক ঠিকভাবে চিনতে পারছে না। সবকিছুই অন্যরকম মনে হচ্ছে, যেন চেনা সমুদ্রটাও অচেনা লাগছে। তারপর আর কোন সিগনাল সেই ফ্লাইট থেকে আসেনি। এভাবেই সেদিন হারিয়ে যায় ফ্লাইট ১৯ এর বিমানটি।

ফ্লাইট ১৯

একইদিন সন্ধায় একটি সার্চ প্লেনকে পাঠানো হয় ফ্লাইট ১৯ কে খুজতে। ফ্লোরিডা থেকে রওয়ানা হওয়ার ২৭ মিনিট পর ওই প্লেনটিও আর কোন সিগনাল পাঠায়নি। ১৩ জন বৈমানিকসহ দ্বিতীয় প্লেনটিও গায়েব হয়ে যায়।

এরকম ঘটনার কথা প্রথম উল্লেখ করেছিলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে। তিনি জাহাজের লগ বুকে লিখে গেছেন তিনি তার নাবিকদের নিয়ে আমেরিকা মহাদেশের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎসমুদ্রে আলোর খেলা দেখতে পান। জাহাজের কম্পাস উল্টোপাল্টা ঘুরতে শুরু করে। এসব দেখে জাহাজের সব নাবিকেরা ভয় পেয়ে যায়।

এ ধরণের ঘটনা শুনলে আপনি অবশ্যই বিশ্বাস করবেন যে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল সত্যিই রহস্যময় জায়গা। আর এসব বিষয়কে ব্যাখ্যা করার জন্যে বিভিন্ন ধরণের থিউরী ও মতামত রয়েছে। কেউ বলেছেন এসব এলিয়েনদের কাজ, এলিয়েনরা জাহাজ ও প্লেনগুলোকে এখান থেকে নিয়ে যেত। কেউ বলেছেন এখানে প্রাকৃতিক ফাটল আছে। বিমান ও প্লেনগুলো সেই ফাটলে পড়ে চিরতরে হারিয়ে যায়। আবার কেউ বলেছেন ফোর্থ ডাইমেনশন বা চতুর্থ মাত্রার কথা। এই থিউরী অনুসারে ওই অঞ্চলে কোন দরজা বা পোর্টেল আছ, যার মধ্য দিয়ে জাহাজ ও প্লেনগুলো অন্য দুনিয়ায় চলে যায়।

এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় আসে যখন এলান অস্টিন ইউএস জাহাজে করে এসে এই অঞ্চলে লোক বিহীন একটি জাহাজ পেয়েছিল।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর বিখ্যাত জাহাজ

এসব ছিল কিছু দূর্ঘটনা, যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে ঘটেছিল। অনেক দুর্ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। আবার কিছু দুঘটনায় আসলে কি হয়েছিল তা জানা যায়নি। আর জাহাজ ও প্লেনগুলো কিভাবে হারিয়ে গিয়েছিল তাও অজানা।

এসব দুর্ঘটনা সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায়নি বলে এমন নয় যে, এই ঘটনাগুলোকে বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা করা যাবে না। কিছু রিসার্চার এই ঘটনাগুলোকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করার জন্যে কাজ শুরু করে দেন এবং তারা কিছু প্রমাণও পেয়ে যান। যা প্রমাণ করে যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল কোন রহস্যময় স্থান নয় বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেখকরা এবং কন্সপেরেন্সি থিউরিস্টরা ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করে আমাদেরকে রহস্য দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

এই অঞ্চলের ঘটনাগুলোকে লেখকরা নিজেদের কল্পনার রঙ মিশিয়ে রহস্যময় করে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করার কারনে মানুষের মনে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল সম্পর্কে ভিতি সৃষ্টি হয়েছে।  এখন আমরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্যের বিজ্ঞান সম্মত কয়েকটি সমাধান নিয়ে আলোচনা করব।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্যের সমাধান

আমেরিকান বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর দুর্ঘটনার জন্যে প্রধানত দায়ী ২৭৩ কিলোমিটার বেগে প্রবাহিত বিধ্বংসী ঝড়। এই ঝড় শুরু হয় হেক্সাগোনাল ক্লাউড বা ষড়ভূজ মেঘ থেকে। বলা হয়ে থাকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর উপর হেক্সাগোনাল ক্লাউড এমনভাবে জমাট বাধছে যে, এর ফলে এয়ার বোম্ব বা বায়ূ বোমা তৈরী হচ্ছে। এই বিধ্বংসী ঝড়ের এতটাই ক্ষমতা যে, এটি সমুদ্রের জলের উপর আঘাত করলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার ঢেউ সৃষ্টি হয়।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল

এ ধরণের ঢেউ যে কোন জাহাজকে মুহুর্তের মধ্যে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। আর প্লেনের উপর আঘাত করলে এটি সাথে সাথে সমুদ্রে আছড়ে পড়বে এবং গভীর সমুদ্রে হারিয়ে যাবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই অঞ্চলে শত শত জাহাজ ও প্লেন ধংস হয়েছে কিন্তু তাদের ধংসাবশেষ খুজে পাওয়া যায়নি কেন? এই বিষয়টিকে দুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

প্রথমটি হচ্ছে গলফ স্ট্রিম। সমুদ্রে দুধরণের স্রোত রয়েছে যার একটি হচ্ছে উষ্ণ স্রোত এবং অপরটি হচ্ছে শীতল স্রোত। গলফ স্ট্রিম হচ্ছে একধরণের উষ্ণ সমুদ্র স্রোত যা মেক্সিকো উপসাগর থেকে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। এই স্রোতের বেগ খুব বেশি তাই একে বলা হয়ে থাকে মহাসমুদ্রের মাঝে প্রবাহিত এক নদী। নদীর স্রোতের মতো গলফ স্ট্রিমও ভাসমান বস্তুকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সে কারণেই হয়ত জাহাজ বা প্লেনের ধংসাবশেষ স্রোতের সাথে ভেসে অন্য কোথাও চলে যায়।

দ্বিতীয়টি জচ্ছে পোর্তো রিকো ট্রেঞ্জ বা খাত। আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরতম খাত হচ্ছে এই পোর্তো রিকো ট্রেঞ্জ। এটি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর মধ্যেই অবস্থিত। এটি সমুদ্র তলদেশে অবস্থিত একটি সুবিশাল গর্ত যার গভীরতা প্রায় ২৮৩৭৩ ফুট। এই গভীরতা থেকে সহজেই বুঝা যায় যে কোন জাহাজ বা প্লেনের ধংসাবশেষ যদি এই গর্তে গিয়ে পড়ে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এর কোন খোজ পাওয়া সম্ভব নয়।

আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে এই অঞ্চলে কম্পাস কেন ঠিকমত কাজ করে না?

লেখক গেইন কুইজার এর মতে, এই অঞ্চলের এটমোসফেয়ার এ ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক এরোম্যালিজ আছে যার ফলে ম্যাগনেটিক কম্পাস এখানে ঠিকমত কাজ করে না। এর ফলসরুপ পাইলট বা নাবিকেরা পথ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হয়।

আরেকটি কারন উল্লেখ করা যায়, আর তা হলো এই অঞ্চলে সমুদ্র তলদেশে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস আছে। যা জাহাজ ডুবার কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে বাতাসের বুদবুদ জলের ঘনত্ব কমিয়ে দেয়। সমুদ্র তলদেশ থেকে যখন প্রচুর পরিমাণে মিথেন বুদবুদ আকারে উদগীরণ হয় তখন জলের প্লাবতা কমে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই জলে ভাসতে থাকা জাহাজ ভারসাম্য হারিয়ে ডুবে যায়।

আমেরিকান সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল বলতে কোন কিছুর অস্তিত্বই নেই। তাদের মতে এই অঞ্চল দিয়ে কার্গো শিপের চলাচল সবচেয়ে বেশি। আর এই অঞ্চলে যতগুলো জাহাজ বা প্লেনের দুর্ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার চেয়ে বেশি নয়। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের মাঝেও এসবের কোন খারাপ প্রভাব পড়ে না।

সবশেষে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে একটি ভয়ংকর ও রহস্যময় স্থান হিসেবে দেখার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা লেখকদের অতিরঞ্জিত লেখার। এসব ঘটনার ব্যাখ্যায় লেখকেরা কল্পনার রঙ লাগিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে ডেভিলস ট্রায়াঙ্গেলে পরিণত করেছে। আশা করি পাঠকরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে জমে থাকা সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন। আর না পেয়ে থাকলে কমেন্টস বক্সে অবশ্যই লিখবেন।

Leave a Reply

Close Menu