রহস্যময় গুপ্ত সংঘ ইলুমিনাতির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

রহস্যময় গুপ্ত সংঘ ইলুমিনাতির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

পৃথিবীতে যতগুলো গুপ্ত সংগঠন বা সিক্রেট সোসাইটি আছে তাদের মধ্যে ইলুমিনাতি সবচয়ে আলোচিত ও পরিচিত নাম। বর্তমানে এমন লোক খুব কমই পাওয়া যাবে যারা ইলুমিনাতি নামটির সাথে পরিচিত নন। সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ইলুমিনাতির সদস্য ও এজেন্ট এর অস্তিত্ব নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।

প্রচুর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী, ফেঞ্চ বিপ্লবের নেপথ্যের কারিগর ছিল ইলুমিনাতি, নেপোলিয়ানের ওয়াটারলোর যুদ্ধের ফলাফলও নির্ধারণ করেছিল ইলুমিনাতি। প্রচলিত আছে, শয়তান পূজার মাধ্যমে স্বার্থ হাসিল করে ইলুমিনাতি। ইসলাম ও খৃষ্টধর্মের তত্ত্ব অনুযায়ী ইলুমিনাতি একচোখা দাজ্জালের আগমনের পথকে সুগম করছে।

ধারণা করা হয় মাইকেল জ্যাকসন থেকে এঞ্জেলিনা জুলি, বিলগেটস থেকে মার্ক জুকারবার্গ, বারাক ওবামা থেকে রাণী এলিজাবেথ এরা সবাই ইলুমিনাতির সদস্য।

আজকের লেখায় আমি ইলুমিনাতি বা শয়তান পুজারীদের কতটুকু বাস্তব আর কতটুকুই বা অবচেতন মনের কল্পনা তা নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমেই আমরা ঘুরে আসি গুপ্ত সংঘ ইলুমিনাতির ইতিহাস থেকে।

ইলুমিনাতির ইতিহাস

ঘটনার শুরু জার্মানির বাভারিয়া নামক প্রদেশে ১লা মে, ১৭৭৬ সাল। জার্মানির ইঙ্গলস্ট্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন প্রফেসর এডাম ওয়েইশপ্ট সর্বপ্রথম ইলুমিনাতির সূচনা করেন। ইলুমিনাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে যারা বিশেষভাবে আলোকিত বা কোন বিশেষ জ্ঞান অর্জনের দাবি করে। এই সংঘের প্রাথমিক উদ্দ্যেশ্য ছিল সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করা এবং জন জীবনে ধর্মীয় ও রাস্ট্রীয় প্রভাব কমানো। সংগঠনটির প্রাথমিক সদস্য ছিল ওয়েইশপ্ট ও তার চার জন ছাত্র। ইলুমিনাতির প্রতীক হিসেবে তারা দেবী মিনারভার পেঁচাকে বেছে নেয়। মিনারভার হলো রোমান রুপকথার জ্ঞানের দেবী।

অনেকে মনে করেন ফ্রিমেসন থেকে ইলুমিনাতির জন্ম হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা ফ্রিমেসন ও ইলুমিনাতি একই সংঘ। কিন্তু উপরোক্ত দুটি ধারণাই ভূল। ফ্রিমেসন ও ইলুমিনাতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সংগঠন। তখনকার সময় ফ্রিমেসনের সদস্যদের ইলুমিনাতি হিসাবে নেওয়া হতো না। বলে রাখা ভালো ইলুমিনাতির জন্মের বহু আগে থেকেই ফ্রিমেসনের অস্তিত্ব ছিল। তখনকার সময় ফ্রিমেসনে যোগ দেওয়া অনেক খরচের ব্যাপারও ছিল। তবে ইলুমিনাতি হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রধান শর্ত ছিল যে, তাকে কোন বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। অর্থাৎ ইলুমিনাতির সদস্যরা মূলত সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর লোক ছিল।

ফরাসী বিপ্লবে ইলুমিনাতির প্রভাব

ইলুমিনাতির সদস্যদের পরিচয় গোপন রাখতে এর প্রতিষ্ঠাতা সকল সদস্যদের ছদ্মনাম ঠিক করেন। তিনি নিজের ছদ্মনাম রাখেন স্পার্টাকাস। সে সময় ইহুদী, ধর্ম গুরু, নারী ও অন্য কোন গোপন সংঘের সদস্যদের জন্যে ইলুমিনাতির সদস্যপদ নিষিদ্ধ ছিল। ১৭৮৪ সালে ইলুমিনাতির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫০। এডাম এই গোপন সংঘের কথা স্বভাবতই গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এটি আর গোপন থাকেনি। ১৭৮৫ সালে বাভারিয়া প্রদেশের শাসক চার্লস থিউডর সকল ধরণের গোপন সংগঠন নিষিদ্ধ করেন। তখন এডাম ফ্রান্সে পালিয়ে যায় এবং ইলুমিনাতির অনেক গোপন নথিপত্র জব্দ করা হয়।

ফরাসি বিপ্লবে ইলুমিনাতির প্রভাব

পরবর্তীতে ১৭৯৮ সালে জন রবিসন “Proofs of Conspiracy” নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ে তিনি ফরাসী বিপ্লবের পেছনে ইলুমিনাতির জোরালো প্রভাব আছে বলে দাবী করেন।

ইলুমিনাতির বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে বহু সংগঠন নিজেদের ইলুমিনাতি বলে দাবী করে। এরা কোন ধরণের গোপনীয়তার ধার ধারে না। এমনকি এদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে ফেইসবুক, টুইটার সহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ফ্যান পেইজও আছে। সদস্য সংগ্রহের জন্যে তারা রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এদের সাথে বাভারিয়ার ইলুমিনাতির কোন সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।

অনেকের মতে বাভারিয়ার ইলুমিনাতির মূল ধারাটি এখনো অতি গোপনে টিকে আছে এবং তা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ১৮০০ সালের পরে সংগঠিত বিভিন্ন বিপ্লব ও যুদ্ধে ইলুমিনাতির সক্রিয় প্রভাব ছিল বলে বিতর্ক আছে। তাছাড়া বর্তমান পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পৃথিবী বিনির্মাণের নীল নকশা তারা অতি গোপনে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে বলে প্রচলিত আছে।

ইলুমিনাতির সাইন বা চিহ্ন

ইলুমিনাতির সবচেয়ে পরিচিত সাইন বা চিহ্ন হচ্ছে এক চোখ। ইসলাম ও খৃষ্ট ধর্মের তত্ত্ব অনুযায়ী এই এক চোখ হচ্ছে দাজ্জালের প্রতীক। কারণ কিয়ামতের আগে যে দাজ্জালের আগমন ঘটবে তার একটি চোখ থাকবে।

ইলুমিনাতির সাইন
ইলুমিনাতির সাইন
ইলুমিনাতির সাইন

তাছাড়া 666 সংখ্যাটিও ইলুমিনাতির চিহ্ন বহন করে। বাইবেলের ভাষ্য অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ডেভিল বা শয়তানকে রিপ্রেজেন্ট করে।

ইলুমিনাতির সাইন
ইলুমিনাতির সাইন
ইলুমিনাতির সাইন

এছাড়াও হাতের দুই আংগুল ব্যবহার করে দেখানো ইয়ো ইয়ো চিহ্নটি ইলোমিনাতিকে রিপ্রেজেন্ট করে। এটি প্রায়ই বিভিন্ন কনসার্টে বা পার্টিতে দেখা যায়। একটু লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে এটি মূলত ডেভিল বা শয়তানের মাথার দুটি শিং এর মতো দেখাচ্ছে।

ইলুমিনাতির সাইন
ইলুমিনাতির সাইন
ইলুমিনাতির সাইন

পিরামিডের উপর এক চোখ, পেঁচা, সাপ এগুলোও ইলুমিনাতির সাইন নির্দেশ করে। ইলুমিনাতিকে রিপ্রেজেন্ট করে এমন আরোও কিছু সাইন বা চিহ্ন দেখানো হলো।

বাংলাদেশে ইলুমিনাতির সদস্য ও এজেন্ট

বাংলাদেশে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান, টিভি চ্যানেল ও মিডিয়া রয়েছে যাদের লগো ও প্রতীকে একচোখ  ব্যবহার করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছে আরটিভি, টাইগার মিডিয়া, নাগরিক টিভি চ্যানেল ইত্যাদি। এদের লগো গুলো নিছক কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত তা আমার জানা নেই। যদি এগুলো পরিকল্পিত হয় তাহলে বিষয়টা অত্যন্ত ভয়ংকর ও স্পর্শকাতর। এগুলো ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লগোর ডানদিকে এক চোখ রয়েছে। এটিএন বাংলার লগোর পেছনে একটি পিরামিড রয়েছে। চ্যানেল আই এর লগোতেও স্পষ্ট একচোখ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সেলিব্রেটি ও শিল্পীদেরকে ইলুমিনাতির বিভিন্ন সাইন প্রমোট করতে দেখা যায়। এই বিষয়টা কি নিছক কাকতালীয় নাকি কোন মার্কেটিং পলিসি নাকি ভয়ংকর কিছুর আগাম সংকেত তা আমি নিশ্চিত নই। তবে আমি প্রত্যাশা করি প্রথম দুটি অপশনের একটি যেন সঠিক হয়।

কনস্পাইরেসি থিউরী বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

ইলুমিনাতি নিয়ে সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে প্রচুর কন্সপাইরেসি থিউরী প্রচলিত আছে এবং এই বিষয়টা সেখানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই থিউরী অনুযায়ী ধারণা করা হয় ইলুমিনাতির সদস্যরা এলিয়েনদের সাথে মিলে কাজ করে যাচ্ছে। এমনকি পঞ্চাশের দশকে একটি ফ্লাইং শশার ক্রাশ এবং সেখান থেকে এলিয়েনদের আটক করার কাহিনীও প্রচলিত আছে। অনেকের ধারণা ইলুমিনাতির সদস্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন গুরুত্ত্বপূর্ণ পদে থাকা মানুষদের রেপটেলিয়ান দ্বারা পরিবর্তন করে যাচ্ছে। এবং এভাবে তারা পৃথিবীর দখল নিয়ে নিচ্ছে। বলে রাখা ভালো, রেপটেলিয়ানরা মানুষের মতো দেখতে হলেও তারা মানুষ আসলে মানুষ নয়। এদের সবচেয়ে কমন বৈশিষ্ট হচ্ছে এরা ইচ্ছা করলেই চোখের রঙ বদলাতে পারে।

এই থিউরী অনুযায়ী মাইকেল জ্যাকসন আসলে রেপটালিয়ান ছিলেন। এছাড়াও বর্তমান পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ও ক্ষমতাধর মানুষদের নিয়েও এমন গুঞ্জন আছে। আমি একবার ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গের একটা সাক্ষাতকার দেখেছিলাম। সেখানে তাকে তার ব্লেজার খুলে দেখাতে বলা হয়। কিন্তু তিনি এতে প্রচন্ড আপত্তি করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ব্লেজার খুলতে হয়েছিল। বেজারটা দেখে আমি সত্যিই সেদিন অনেক অবাক হয়েছিলাম। কারণ ব্লেজারের ভেতরের দিকে পেছনের অংশে ইলুমিনাতির সাইন আঁকা ছিল। তাহলে কন্সপাইরেসি থিউরীর কি আসলেই কোন বাস্তব ভিত্ত্বি আছে?

শেষ কথা

এই লেখায় আমি ইলুমিনাতি নিয়ে অনেক প্রচলিত ধারণা ও থিউরী নিয়ে কথা বলেছি। এর কোনটাই আমার ব্যাক্তিগত মতামত বা বিশ্বাস নয়। আমি মূলত গোপন সংঘ ইলুমিনাতি নিয়ে বর্তমান সমাজে আলোচিত কিছু রহস্য ও চমকপ্রদ তত্ত্ব উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। সত্যতা নির্ণয়ের দায়িত্ত্বটা পাঠকদের উপরই ছেড়ে দিলাম। শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্যে সকলকে ধন্যবাদ।


অন্যান্য লেখাসমূহঃ

This Post Has One Comment

  1. I do appreciate this such kind of hard and encouraging endeavour.

Leave a Reply

Close Menu