নিউটনের সূত্র (বলবিদ্যার মৌলিক সূত্র)

নিউটনের সূত্র (বলবিদ্যার মৌলিক সূত্র)

স্যার আইজ্যাক নিউটন পদার্থ বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল তারকা যিনি ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিকস এর ভিত্তি রচনা করেছিলেন এবং একই সাথে গণিতের আধুনিক একটি শাখা ক্যালকুলাসের জন্ম দিয়েছিলেন। গতি সম্পর্কিত নিউটনের সূত্র সমূহ বলবিদ্যার মৌলিক সূত্র সমূহের মধ্যে অন্যতম। নিউটনের জন্মের প্রায় ২০০ বছর আগে গ্যালিলিও পড়ন্ত বস্তুর সূত্র প্রকাশ করেছিলেন, যা তিনি গতি সূত্রের সাহায্যে গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে পূর্ণতা দিয়েছিলেন। আমাদের আজকের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে গতি সম্পর্কিত নিউটনের সূত্র সমূহ।

আমাকে একজন বলেছিলেন যে, লেখার মধ্যে গণিত নিয়ে আসলে নাকি পাঠক অর্ধেক কমে যায়।  তাই আজকের আলোচনায় কোন প্রকার গাণিতিক সমীকরণ কিংবা সিম্বল ব্যবহার না করে সহজ ভাষায় গতি সূত্র গুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।  

১৬৮৭ সালে প্রকাশিত “ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা” নামক বইয়ে নিউটন গতি সম্পর্কিত তিনটি সূত্র প্রকাশ করেন।

নিউটনের সূত্র
১৬৮৭ সালে প্রকাশিত বইয়ে গতি সম্পর্কিত নিউটনের সূত্র

নিউটনের সূত্র গুলো হলোঃ

প্রথম সূত্রঃ বাহ্যিক কোন বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল একই গতিতে চলতে থাকবে।  

দ্বিতীয় সূত্রঃ ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক।

তৃতীয় সূত্রঃ প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।

নিউটনের প্রথম সূত্রের ব্যাখ্যাঃ

কোন বস্তুর উপর বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এ বিষয়টি আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। কিন্তু গতিশীল বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকার বিষয়টি আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে না। আমারা সাধরণভাবে দেখি গতিশীল বস্তুকে বল প্রয়োগ করা বন্ধ করে দিলে ধীরে ধীরে থেমে যায়। এর কারণ বুঝতে হলে আমাদের মধ্যাকর্ষণ বল এবং ঘর্ষন বল সম্পর্কে জানতে হবে।

মধ্যাকর্ষণ বলের কারণে পৃথিবী সকল বস্তুকে নিজের দিকে সর্বদা টানতে থাকে। তাই আমরা বস্তব জীবনে যতো ধরণের গতিশীল বস্তু দেখতে পাই সকল ক্ষেত্রেই মধ্যাকর্ষণ বল কাজ করছে। এছাড়া কোন বস্তুর উপর আরেকটি বস্তু চলতে থাকলে বা চলার চেষ্টা করলে ঘর্ষণ বল কাজ করে। তাই আমাদের বাস্তব জীবনে সচরাচর যতো গতিশীল বস্তু দেখে থাকি তার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বাহ্যিক বল কাজ করছে। সঙ্গত কারণেই গতিশীল বস্তু চিরিকাল গতিশীল থাকছে না।

নিউটনের প্রথম সূত্রের একটি বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে কৃত্তিম উপগ্রহ। কৃত্তিম উপগ্রহকে যখন তার কক্ষপথে পাঠানো হয় তখন তাকে এমন ভাগে গতিশীল করা হয় যেন তার গতির কারণে সৃষ্ট কেন্দ্রবিমূখী বল এবং মধ্যাকর্ষণ বলের কারণে সৃষ্ট কেন্রমূখী বল পরস্পর সমান হয়। এই দুটি বিপরীতমূখী বলের কারণে কৃত্তিম উপগ্রহে বাহ্যিক কোন বল কাজ করে না। ফলে কৃত্তিম উপগ্রহ নির্দিষ্ট কক্ষপথে সমান দ্রুতিতে চিরকাল চলতে থাকে।

এছাড়া আমরা সৌরজতের দিকে তাকালে দেখতে পাই প্রতিটি গ্রহ উপগ্রহ তার নিজস্ব কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতি নিয়ে আবর্তন করছে।  সকল ক্ষেত্রেই বাহ্যিক বল না থাকার কারণে গ্রহ উপগ্রহগুলো নিজস্ব কক্ষপথে আবর্তন করছে। এটিই নিউটনের প্রথম সূত্রের বাস্তব প্রমাণ।

চলন্ত বাস হঠাত থেমে গেলে আমরা সামনের দিকে ঝুকে পড়ি কিংবা থেমে থাকা বাস হঠাৎ চলতে শুরু করলে আমরা পেছন দিকে হেলে পড়ি। এর মূল কারণ হচ্ছে স্থির বস্তুর স্থির থাকার প্রবণতা কিংবা গতিশীল বস্তুর গতিতে থাকার প্রবণতা। এটিও নিউটনের প্রথম সূত্রের একটি পরোক্ষ প্রমাণ।

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের ব্যাখ্যাঃ

ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক। অর্থাৎ সময়ের সাথে ভরবেগের যে পরিবর্তন হবে তা প্রযুক্ত বলের সাথে সমানুপাতিক হবে। উদাহরণ স্বরুপ রকেট উৎক্ষেপণের সময় জ্বালানী পুড়িয়ে ভরবেগের যে পরিবর্তন ঘটানো হয় তা থেকে সমানুপাতিক হারে বল প্রযুক্ত হয়। রকেটের নিচ দিয়ে জ্বালানী নির্গত হওয়ার কারণে ভরবেগের পরিবর্তণ হয় ও বিপরীত দিকে অর্থাৎ উপরের দিকে বল প্রযুক্ত হয়। এভাবে ভরবেগের পরিবর্তন ঘটিয়ে বল প্রয়োগ করে রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়, যা নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের বাস্তব প্রমাণ।

এছাড়া বন্দুক থেকে গুলি ছোড়ার সময় বন্দুক পেছনের দিকে চলে আসে মূলত ভরবেগের পরিবর্তনের হার থেকে সৃষ্ট সমানুপাতিক বলের কারণে। এটিও নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের বাস্তব প্রমাণ।

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী ধ্রুব ত্বরণে গতিশীল বস্তুর নিট বল তার ভর ও ত্বরণের গুণফলের সমান।

নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ব্যাখ্যাঃ

যখন কোন বস্তুর উপর দ্বিত্বীয় আরেকটি বস্তু বল প্রয়োগ করে তখন প্রথম বস্ততুটিও দ্বিতীয় বস্তুর উপর সমান ও বিপরীতমূখী বল প্রয়োগ করে।

আমরা যখন কোন দেয়ালের গায়ে বল ছুড়ে মারি তখন তা আবার আমাদের দিকেই ফিরে আসে। এর মূল কারণ হচ্ছে বলটি যখন দেয়ালের উপর বল প্রয়োগ করে তখন দেয়ালটি বলের উপর সমান ও বিপরীতমূখী বল প্রয়োগ করে। তাই বলটি আমাদের দিকে ফিরে আসে। এটিই নিউটনের তৃতীয় সূত্রের বাস্তব প্রমাণ।

এছাড়া নদীতে দ্বাড় বেয়ে নৌকা চালানো, মাটির উপরে হাটতে পারা এগুলো সবই নিউটনের তৃতীয় সূত্রের বাস্তব প্রমাণ।

নিউটনের সূত্র

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রঃ

গতিসূত্র ছাড়াও বলবিদ্যায় নিউটনের আরেকটি মৌলিক সূত্র রয়েছে। এটি হচ্ছে মহাকর্ষ সূত্র

“মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বল বস্তুকণাদ্বয়ের ভরের গুণফলের সমাণুপাতিক, তাদের দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক এবং এই আকর্ষণ বল তাদের সংযোজক সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে।“ – এটিই নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র।

মহাকর্ষ বল হচ্ছে একটি মৌলিক বল। জেনে রাখা ভালো, আমাদের এই মহাবিশ্বে চারটি মৌলিক বল রয়েছে। এগুলো হলো মহাকর্ষ বল, তড়িৎ চুম্বকীয় বল, সবল নিউক্লিয় বল এবং দুর্বল নিউক্লিয় বল।

দুটি বস্তুর মধ্যে একটি পৃথিবী হলে তাদের মধ্যে যে মহাকর্ষ বল কাজ করে তাকে অভিকর্ষ বল বলে। মহাকর্ষ কিংবা অভিকর্ষ বলের সীমা অসীম। বস্তুর ভর বেশি হলে তার আকর্ষণ বল বেশি হবে এবং ভর কম হলে তার আকর্ষণ বল কম হবে। দুরত্ব বাড়ার সাথে সাথে এই আকর্ষন বল কমতে থাকে। এটিই নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের সাধারণ ব্যাখ্যা।

শেষকথাঃ

আমি চেষ্টা করেছি বলবিদ্যা সম্পর্কিত নিউটনের সূত্র সমূহ সহজভাবে উপস্থাপন করতে। কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কিংবা পরামর্শ থাকলে কমেন্টস সেকশনে লেখার অনুরোধ রইলো। লেখার ভূল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ!


আমাদের অন্যান্য লেখা সমূহঃ

এসিড বৃষ্টি কেন হয়?

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য

দাবা খেলার নিয়ম কানুন

পিরামিড সহস্য ও এলিয়েন ইতিকথা

মোনালিসা ছবির রহস্য

Leave a Reply

Close Menu