এসিড বৃষ্টি কেন হয়? (এসিড বৃষ্টির আদ্যোপান্ত)

এসিড বৃষ্টি কেন হয়? (এসিড বৃষ্টির আদ্যোপান্ত)

আজকে আমরা আলোচনা করব এসিড বৃষ্টি নিয়ে। এসিড বৃষ্টি কি? এসিড বৃষ্টি কেন হয়? এসিড বৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব এবং এসিড বৃষ্টি প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কি? তাহলে শুরু করা যাক।

এসিড বৃষ্টি কি?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যে বৃষ্টিতে এসিড থাকে তাকে এসিড বৃষ্টি বলে। সাধারণ পানির PH হচ্ছে ৭, অর্থাৎ যে পানিতে এসিড কিংবা ক্ষার কোন কিছুই নেই সেই পানির PH হচ্ছে ৭। পানিতে এসিড মিশ্রিত করলে তার PH এর মান ৭ এর কম হবে। তাই এসিড বৃষ্টির পানির PH সর্বদা ৭ এর কম হয়। সাধারণত এসিড বৃষ্টির পানির PH এর মান ৫.৬ এর কম হয়।

এসিড বৃষ্টির পানিতে সাধারণত সালফিউরিক এসিড, কার্বনিক এসিড, নাইট্রিক এসিড এবং বিভিন্ন অম্লীয় বা এসিডিক অক্সাইড মিশ্রিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ সকল এসিড এবং অম্লীয় অক্সাইড এর কারণে এসিড বৃষ্টির পানির PH সাধারণ পানির চেয়ে অনেক কম হয়।

এসিড বৃষ্টি কেন হয়?

আমরা জানলাম যে, এসিড বৃষ্টির পানিতে বিভিন্ন ধরণের এসিড মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বৃষ্টির পানির সাথে এই এসিড গুলো কিভাবে মিশ্রিত হয়? এর উত্তর হচ্ছে, দুটি উপায়ে এই এসিড গুলো বৃষ্টির পানির সাথে মিশ্রিত হতে পারে। যার প্রথমটি হচ্ছে মানব সৃষ্ট এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রাকৃতিক উপায়। তাই বলা যায়, এসিড বৃষ্টির দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে মানব সৃষ্ট কারণ এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রাকৃতিক কারণ।

এসিড বৃষ্টির মানব সৃষ্ট কারণঃ ( এসিড বৃষ্টি কেন হয়? )

১. বিভিন্ন শিল্প কারখানায় সালফিউরিক এসিড ব্যবহারের কারণে সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। এই গ্যাস বাতাসে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। বৃষ্টির সময় সালফার ডাই অক্সাইড পানির সাথে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সালফিউরিক এসিড উতপন্ন করে, যা বৃষ্টির পানির সাথে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। এছাড়াও সালফিউরিক এসিডকে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে বাষ্পীভূত হতে থাকে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত সালফিউরিক এসিড হতে বাতাসে সালফউরিক এসিডের বাষ্প মিশ্রিত হয়। এই এসিড বাষ্প বৃষ্টির পানির সাথে মিশে এসিড বৃষ্টি হয়।

২. বিভিন্ন যানবাহন, ইটের ভাটা ও কলকারখানা থেকে নির্গত কালো ধোয়ায় প্রচুর পরিমানে কার্বন ডাই অক্সাইড থাকে, যা বাতাসে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে। এই কার্বন ডাই অক্সাইড বৃষ্টির পানির সাথে বিক্রিয়া করে কার্বনিক এসিড রুপে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয় এবং এসিড বৃষ্টি সৃষ্টি করে।

৩. বিভিন্ন কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে প্রচুর পরিমানে নাইট্রোজেনের অক্সাইড নির্গত হয় যা নাইট্রিক এসিড রুপে বৃষ্টির পানির সাথে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয় এবং এসিড বৃষ্টি সৃষ্টি করে।

৪. এছাড়াও আমরা যে সকল জৈব জ্বালানি ব্যবহার করি তা থেকে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হচ্ছে। বাতাসে অধিক পরিমান কার্বন ডাই অক্সাইড জমা হলে তা থেকে এসিড বৃষ্টি হতে পারে।

এসিড বৃষ্টির প্রাকৃতিক কারণঃ ( এসিড বৃষ্টি কেন হয়? )

১. বজ্রপাতের সময় বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস বিক্রিয়া করে নাইট্রোজেনের অক্সাইড তৈরী করে। যা বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নাইট্রিক এসিড তৈরী করে। এভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে বজ্রপাতের মাধ্যমে নাইট্রিক এসিড উৎপন্ন হয়ে এসিড বৃষ্টি হতে পারে।

এসিড বৃষ্টি কেন হয়?

২. আগ্নেয়গিরীর অগ্নুতপাতের সময় সালফারের বিভিন্ন যৌগ পোড়ার কারণে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়। যা বৃষ্টির পানির সাথে মিশে সালফিউরিক এসিড তৈরী করে। এভাবেও প্রাকৃতিক উপায়ে এসিড বৃষ্টি হতে পারে।

৩. দাবানলের সময় গাছপালা পোড়ার কারণে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড জমা হয়। পরবর্তীতে বৃষ্টির সময় কার্বনিক এসিড রুপে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। এভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে এসিড বৃষ্টি হতে পারে।

এসিড বৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাবঃ

১. এসিড বৃষ্টির কারণে মাটির PH অনেক কমে যায় অর্থাৎ মাটিতে এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলে মাটিতে বিদ্যমান বিভিন্ন অণুজীব এবং গাছপালার জন্যে জীবন ধারণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এছাড়া মাটি এসিডিক বা অম্লীয় হওয়ার কারণে ফসল উতপাদন ব্যহত হয়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

২. গাছপালার উপর এসিড বৃষ্টি পড়লে পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং গাছের সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। এসিড বৃষ্টির পানি পুকুর এবং নদীর পানির সাথে মিশে পানির PH কমিয়ে দেয়। এর ফলে পানিতে বিদ্যমান জলজ উদ্ভিদ এবং মাছের জন্যে জীবন ধারণ করা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

৩. এসিড বৃষ্টির কারণে জীবদেহের ত্বকের অনেক ক্ষতি সাধণ করে। মানব দেহের উপর এসিড বৃষ্টি পড়লে তা ত্বকের কোষের ক্ষতি করে এবং ক্যান্সার নামক জটিল রোগ হতে পারে।

৪. ঘর বাড়ি ও দালান কোঠার উপর এসিড বৃষ্টি পড়লে রঙ বিবর্ণ বা নষ্ট হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য তাজমহলের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে অনেক কলকারখানা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কারণ এসিড বৃষ্টির কারণে তাজমহল তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছিলো।

৫. এসিড বৃষ্টির কারণে গাছপালা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে বনাঞ্চলের উপর এর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এর ফলে বন জংগল উজার হয়ে যেতে পারে এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

আশা করছি এসিড বৃষ্টি কেন হয়? এর উত্তর আপনারা পেয়ে গেছে। এখন তাহলে এসিড বৃষ্টি প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কি?

এসিড বৃষ্টি প্রতিরোধে আমাদের করণীয়ঃ

১. কলকারখানা থেকে সালফার ডাই অক্সাইড ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড সমূহ সরাসরি বাতাসে ছাড়া যাবে না। এসব ক্ষতিকর গ্যাস পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সম্ভব হলে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী (রি-ইউজ) করতে হবে।

২. ইটের ভাটা থেকে সরাসরি কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছাড়া যাবে না। বর্তমান সময়ে অটো ব্রিক ফিল্ড গুলো থেকে সরাসরি কোন ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসে মিশ্রিত হয় না। তাই পুরোনো প্রযুক্তির সকল ইটের ভাটা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিতে হবে। আশার কথা হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ক পরিকল্পনা বাস্তয়নাধীন রয়েছে।

৩. যানবাহন থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড যুক্ত কালো ধোয়া নির্গমণ বন্ধ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে ভালো অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া যানবাহনে নবানযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৪. পরিশেষে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এসিড বৃষ্টির বিষয়ে আরোও সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরী করতে হবে এবং নবায়ন যোগ্য জ্বালানী ব্যবহারের উপর বিশেষ জোর দিতে হবে।

শেষ কথাঃ

লেখাটি ভালো লাগলে লেখার লিংক বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন, যা আমাকে গুগুল র‍্যাঙ্কিং পেতে সাহায্য করবে। কোন পরামর্শ কিংবা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা থাকলে কমেন্টস সেকশনে লিখবেন। লেখার ভূল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ!


আমাদের অন্যান্য লেখা সমূহঃ

বৃষ্টিপাত মাপার পদ্ধতি

দাবা খেলার নিয়ম কানুন

জীবনে ভিন্ন কিছু করার উপায়

অনলাইনে টাকা ইনকাম করার সহজ উপায়

পিরামিড রহস্য ও এলিয়েন ইতিকথা

Leave a Reply

Close Menu