আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ করে সৌরমন্ডলের বাইরে যাওয়া কি সম্ভব?

আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ করে সৌরমন্ডলের বাইরে যাওয়া কি সম্ভব?

আমরা মুটোমুটি সবাই নিশ্চয় স্পেসশিপে করে সৌরমন্ডলের বাইরে মহাকাশ পরিভ্রমণের সুযোগ পেলে তা হাতছাড়া করব না। কিন্তু বাস্তবে কি তা সম্ভব? আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের কাছে যা আছে তা নিয়ে আপাদত আমরা আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ করে সৌরমন্ডলের বাইরে যেতে পারব না। তবে সাইন্স ফিকশনের কাছে তা সম্ভব, যা মূলত ভবিষ্যত সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রের নাম হচ্ছে প্রক্সিমা সেন্টরাই, যা আমাদের সূর্য থেকে ৪.২২ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ আমরা যদি আলোর বেগে পরিভ্রমন করতে সক্ষম হই, তাহলে সূর্যের নিকটবর্তী নক্ষত্রে যেতে ৪.২২ বছর লাগবে।

আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত এটা আশা করতেই পারে যে, মানুষের তৈরী মহাকাশযান কোন না কোন একদিন আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ করে সূর্যের সবচেয়ে কাছের স্টার সিস্টেমে পৌছাতে পারবে। সেখান থেকে হয়ত ছবি বা তথ্য পাঠানো সম্ভব হবে। কিন্তু কোন মানুষ যদি সেই স্টার সিস্টেমে যেতে চায় তাহলে তাকে অমর হতে হবে। কিন্তু তা কেন?

আলোর গতিতে পরিভ্রমন করলে আমাদের সূর্যের সবচেয়ে কাছের স্টার সিস্টেমে যেতে সময় লাগবে ৪.২২ বছর। কিন্তু আমরা কি আলোর গতিতে পরিভ্রমন করতে পারব?আলো সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার পরিভ্রমন করতে পারে। এই গতিতে আমরা পৃথিবীকে মাত্র এক সেকেন্ডে তিনবার প্রদক্ষিণ করতে পারব, যা আপাদত সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ

বন্দুকের গুলির বেগ হয় সর্বোচ্চ ১৫০০ মিটার/সেকেন্ড। ভয়েজার ১ মকাশযান এর গতি ১৭০০০ মিটার/সেকেন্ড। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ২৯,৮০০ মিটার/সেকেন্ড গতিতে ঘুরছে। মানুষের তৈরী সবচেয়ে বেশি গতিশীল অবজেক্ট হলো হিলিয়াস ২ সোলারপ্রোব যার গতি সেকেন্ডে ৭০,২২০ মিটার।

এখন পর্যন্ত মানুষের তৈরী করা সবচেয়ে গতিশীল অবজেক্ট এর গতিতেও যদি আমরা আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ করতে পারি তাহলে প্রক্সিমা সেন্টরাই এ পৌছতে ১৯০০০ বছর লেগে যাবে। অর্থাৎ মানুষের পক্ষে তার জীবনকালে এই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব নয়। তবে আপনি হতাশ হবেন না। আমরা এখানে কিছু ভবিষ্যত সম্ভাবনার কথা নিয়ে আলোচনা করব।

মনে করা যাক আমরা এমন একটি মহাকাশযান তৈরী করলাম যা আমাদের সবচেয়ে গতিশীল অবজেক্ট এর গতিতে পরিভ্রমন করতে পারবে এবং আমরা এই মহাকাশযানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম থাকতে পারব। এ ধরণের মহাকাশযানকে বলা হয় জেনারেশন শিপ। আমরা যদি এরকম জেনারেশন শিপ তৈরি করতে পারি তাহলে আমাদের প্রায় ৬০০ এর চেয়ে বেশি জেনারেশন লেগে যাবে।

আন্ত নক্ষত্র পরিভ্রমণ

১৯০০০ বছর পর মানুষ যখন সেখানে পৌছাবে তখন তারা হবে প্রথম মানুষ যারা সৌরমন্ডলের বাইরে প্রথম পা দিবে এবং সৌরমন্ডলের বাইরে মনুষ্য সভ্যতার সূত্রপাত ঘটাবে। এই মানুষগুলো যারা এই একটি মাত্র লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে মহাকাশযানে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিবে তাদের এই ত্যাগ বৃথা যাবে না। কিন্তু সব কিছুই মাটি হয়ে যাবে যদি দেখা যায় মানুষের চেয়ে আরো অনেক উন্নত সভ্যতা সেখানে বিরাজ করছে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব?

আমরা যে হিসেবটি করলাম বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে মানুষের তৈরি সবচেয়ে গতিশীল বস্তুকে বিবেচনায় নিয়ে, সেই হিসেবটি কি আগামী এক হাজার বছর পর একই থাকবে? নিশ্চই তা নয়। তখন হয়ত মানুষ আলোর বেগের কাছাকাছি গতির মহাকাশযান তৈরী করে ফেলবে। আজকে যেখানে আমরা ১৯,০০০ বছরের হিসাব করছি তা আগামী ৫০০ বছর পর হয়ত ১০,০০০ বছরে এসে দাড়াবে। একই হিসাব হয়ত আগামী ১০০০ বছর পর ৫০০০ বছরে এসে ঠেকবে।

এভাবে সময়ের পরিক্রমায় সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে এবং বর্তমান সময়ে যাত্রা করা কোন স্পেসশিপের ১৫০০০ বছর আগেই এক হাজার বছর পরে যাত্রা করা স্পেসশিপ গন্তব্যে পৌছে যাবে। কারণ একটা মহাকাশযানকে প্রক্সিমা সেন্টরাই এর দিকে পাঠিয়ে দিয়েই পৃথিবী থেমে যাবে না। বরং আমরা দিন দিন টেকনলজির দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

আমাদের কাছে থিউরী রয়েছে যা দিয়ে আমরা আলোর গতিতে পরিভ্রমণ পারব। আজকে যা আমাদের কাছে থিউরী আগামীকাল তা বাস্তব। আগামী এক হাজার বছর পরের পৃথিবীর টেকনলজি কেমন হবে তা বর্তমান সময়ে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। তখন হয়ত এমন মহাকাশযান তৈরী হয়ে যাবে যা আলোর গতিতে না হলেও তার কাছাকাছি গতিতে চলে ৫০০ বছরের মধ্যেই প্রক্সিমা সেন্টরাই এ পৌছে যাবে।

আজকে যদি কোন মহাকাশযান আমরা প্রক্সিমা সেন্টরাই এর দিকে পাঠাই তবে এই মহাকাশযানের ১৭,৫০০ বছর আগেই এক হাজার বছর পরের মহাকাশযান সেখানে পৌছে যাবে। ফলে বর্তমান সময়ে যাত্রা করা মানুষ সেখানে পৌছে অনেক উন্নত মানব সভ্যতা দেখতে পাবে।

ভবিষ্যত মানব সভ্যতা

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে বর্তমান সময়ে যাত্রা করা মহাকাশচারীদের যে ত্যাগ, তার প্রতিদান কি ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে? এই হিসাবটিকে বলা হয়ে থাকে ওয়েট ক্যালকুলেশান। তাহলে সেই সময়টি কখন হবে যখন মানুষের উচিত হবে সূর্যকে ছেড়ে অন্য কোন স্টার সিস্টেমে যাত্রা শুরু করার?

এই প্রশ্নটির উত্তর সম্ভবত প্রথম দিয়েছিলেন এনড্রিও কেনেডি ২০০৬ সালে। তিনি বলেন মানুষ মহাকাশে ভ্রমণ করার জন্যে কোন না কোন একদিন স্পেসশিপ বানাবেই, যার গতি হবে অনেক বেশি। তার মানে হচ্ছে আমরা যখন এমন কোন টেকনলজি আবিষ্কার করতে পারব তখনি আমাদের উচিত হবে সূর্যকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাত্রা শুরু করা।

যদি তাড়াহুড়া করে আমরা তা এখনই শুরু করে দেই তাহলে ফলাফল কিছুই আসবে না। তবে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, সময়টি কখন সঠিক হবে? এটা খুবই কঠিন একটা প্রশ্ন। মানুষ যে হারে অগ্রসর হচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে এনড্রিও কেনেডি একটা হিসাব করেন যখন হয়ত আমরা সৌরমন্ডলের বাইরে কোথাও যেতে পারব এবং সময়টি হচ্ছে আজ থেকে ১০৯৯ বছর পর।

এই সময় পর্যন্ত আমরা আজকের পৃথিবীর কেউই থাকব না। এ ধরণের মহাকাশযান তৈরীর পেছনে অনেক বাধা রয়েছে। যেখানে গতি ছাড়াও আরও অনেক পারিপার্শ্বিক বাধাকে অতিক্রম করতে হবে। উদাহরণ সরুপ মহাশূন্যের প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে থাকা ১০ টি হাড্রোজেন এটম যা বুলেটের মত মহাকাশযানকে আঘাত করবে, এত বিশাল ক্ষমতার মহাকাশযানের ফুয়েল কিভাবে আসবে ইত্যাদি আরো অনেক প্রতিবন্ধকতা।

আমরা অবশ্যই মনে করি আমাদের ভবিষ্যত অনেক সম্ভাবনাময়, যদি না আমাদের সভ্যতা কোন প্রাকৃতিক কারণে বা মনুষ্য সৃষ্ট কোন কারণে ধ্বংস না হয়ে যায়।

Leave a Reply

Close Menu