আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ও ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ও ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র

জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সারা পৃথিবীতে আপেক্ষিক তত্ত্ব বা থিউরী অব রিলেটিভিটি এর জন্যে বিখ্যাত। তিনি এমন এক সময় এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন যখন তার সমসাময়িক পদার্থবিদেরা অনেকেই এটি ঠিকমতো বুঝতেও পারতো না, এমনকি এর সত্যতা নিয়েও অনেক বিতর্ক তৈরী হয়েছিল। এ বিষয়ে আইনস্টাইনের বক্তব্য ছিল এরকম, “ভবিষ্যতে আমার আপেক্ষিক তত্ত্ব যদি সঠিক প্রমানিত হয় তাহলে জার্মানরা আমাকে শেষ্ঠ জার্মান বলবে আর ফ্রান্স আমাকে বিশ্ব নাগরিক বলবে, যদি আমার তত্ত্ব ভূল প্রমানিত হয় তাহলে ফ্রান্স আমাকে জার্মান বলবে আর জার্মানরা আমাকে ইহুদী বলবে।“ আইনস্টাইনের এরকম উক্তি থেকে তখনকার পরিবেশটা সহজেই অনুমান করা যায়।  

আপেক্ষিক তত্ত্ব কি?

আইনস্টাইনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল আপেক্ষিক তত্ত্বের সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা কি? উত্তরে আইনস্টাইন বলেছিলেন, যদি আপনি একটি উত্তপ্ত উনুনের পাশে বসে থাকেন তাহলে কয়েক মিনিটকে কয়েক ঘন্টা মনে হতে পারে আর যদি আপনার প্রেমিকার সাথে কয়েক ঘন্টাও বসে থাকেন তাহলে কয়েক মিনিট মনে হবে; -এটিই আপেক্ষিকতা।

তবে যাই হোক, এখন পড়াশুনায় আসি। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার দুটি তত্ত্ব আছে। প্রথমত ১৯০৫ সালে প্রকাশিত বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (স্পেশাল থিউরী অব রিলেটিভিটি)। দ্বিতীয়ত ১৯১৫ সালে প্রকাশিত সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব (জেনারেল থিউরী অব রিলেটিভিটি)। আজকে আমরা মূলত স্পেশাল থিউরী অব রিলেটিভিটি নিয়ে আলোচনা করব।

আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্য

তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানে যে কোন থিউরী ডেভলপ করতে গিয়ে কোন স্বীকার্য থাকবে না তা যেন পৃথিবীর নবম আশ্চার্য হবে। (আইনস্টাইন কম্পাউন্ড ইফেক্টকে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চার্য বলেছিলেন, আমি তাই পরেরটা বললাম। আর প্রথম সাতটা তো সবাই জানেন ধরে নিলাম।) এই যে ধরে নেওয়ার কথা বললাম এটাও একটা স্বীকার্য; যা আপনাকে মেনে নিতে হবে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়তে গেলে দেখবেন স্বীকার্য বুঝতে বুঝতেই অবস্থা খারাপ, আসল জিনিস আর কখন পড়বেন!

স্বীকার্য নিয়ে এতো কিছু বলার পরও আপনি যদি বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের স্বীকার্যগুলা জানতে চান তাহলে জেনে নিনঃ

প্রথম স্বীকার্য

সকল জড় প্রসংগ কাঠামোতে পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র সমূহ একই রকম বা অভিন্ন থাকে।

ব্যাখ্যাঃ যে কোন প্রসংগ কাঠামো, স্থির বা গতিশীল যাই হোক না কেন নিউটনের বলবিদ্যার গতিসূত্র বা অন্যান্য সূত্র সমূহ একই রকম হবে। এক্ষেত্রে কোন রকম পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না।

দ্বিতীয় সীকার্য

আলোর গতিবেগ সকল প্রসংগ কাঠামো এবং সকল অবস্থায় একই হবে।

ব্যাখ্যাঃ শূন্য মাধ্যম, বায়ূ মাধ্যম, স্থির মাধ্যম কিংবা গতিশীল মাধ্যম সকল অবস্থায় এবং সকল প্রসংগ কাঠামোর সাপেক্ষে আলোর বেগ সর্বদা একই হবে। অর্থাৎ আলোর বেগ সর্বদা কনস্ট্যান্ট।

আমি আগেই বলেছি, যে কোন থিউরী শুরু করার আগে তার স্বীকার্য গুলো আগে মেনে নিতে হবে। আপনার যদি স্বীকার্য গুলো মেনে নিতে কষ্ট হয় তাও মেনে নিতে হবে। আর যদি মেনে নিতে না পারেন তাহলে পরবর্তী ধাপে আর যেতে পারবেন না। তাই পরবর্তী ধাপে যেতে চাইলে স্বীকার্য গুলো আগে মেনে নিন।

আপনারা এতক্ষণে নিশ্চই বুঝে গেছেন, তখনকার সময় আইনস্টানের এই তত্ত্ব বুঝা বা মেনে নেওয়া অন্যদের জন্যে কঠিনই ছিল। কারন দুটি পরস্পরের সাপেক্ষে গতিশীল প্রসংগ কাঠামো থেকে আলোর বেগ একই হওয়া বাস্তব চিন্তায় অসম্ভব মনে হয়। এখানে মূলত আলোর বেগ এবং পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র সমূহকে পরম ধরা হয়েছে। বাকী সকল কিছুই অর্থাৎ সময়, দৈর্ঘ্য, ভর ইত্যাদি সবই আপেক্ষিক।  

ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র

ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র। আমরা অনেকেই এই সূত্রের সাথে আপেক্ষিক তত্ত্বকে গুলিয়ে ফেলি। এই সূত্রটি মূলত আপেক্ষিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে প্রতিপাদন করা হয়েছে। এই সূত্রটিই প্রথম আমাদেরকে ধারণা দেয় পদার্থের মধ্যে কি পরিমাণ পারমাণবিক শক্তি সঞ্চিত আছে! এই সূত্রটিই মানুষকে প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকি বিস্ফোরণের পর আইনস্টাইন অবশ্য তার আবিষ্কারের এমন ভয়াবহ ব্যবহার দেখে আফসোস করে বলেছিলেন, তিনি আগে জানলে এই জনিস কখনো আবিষ্কারের চেষ্টাও করতেন না।

আপেক্ষিক তত্ত্বের মূল বক্তব্য

আমি লেখার সময় মাঝে মধ্যে লাইন হারিয়ে ফেলি। যাই হোক, এখন আবার আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বে আসা যাক। তিন ধরণের আপেক্ষিকতা নিয়ে এই তত্ত্বের আলোচনা,

  • সময়ের আপেক্ষিকতা  
  • দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা
  • ভরের আপেক্ষিকতা

লেখার মধ্যে গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করলে নাকি পাঠক সংখ্যা এক্সপোনেনশিয়ালি কমতে থাকে। এই জন্যেই নাকি স্টিফেন হকিংস তার “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বা এ ব্রিফ হিসটোরি অব টাইম“ বইয়ে গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করেননি। তাই আমিও আজকে কোন গাণিতিক ব্যাখ্যা বা সমীকরণ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

প্রথমেই আসা যাক সময়ের আপেক্ষিকতায়

গতিশীল ঘড়ি ধীরে চলে আর স্থির ঘড়ি দ্রুত চলে। এটিই সময়ের আপেক্ষিকতার মূলকথা। সময়ের আপেক্ষিকতার বাস্তব প্রমাণ কৃত্রিম উপগ্রহের ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় ধীরে চলে এবং এ জন্যে টাইম এডজাস্টমেন্ট করার প্রয়োজন হয়।  

দ্বিতীয়ত হচ্ছে দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা

এই তত্ত্ব অনুযায়ী স্থির অবস্থার চেয়ে গতিশীল অবস্থায় বস্তুর দৈর্ঘ্য বেশি হবে। অর্থাৎ সময়ের আপেক্ষিকতা ও দৈর্ঘের আপেক্ষিকতা পরস্পরের ব্যাস্তানুপাতিক।

সর্বশেষ হচ্ছে ভরের আপেক্ষিকতা

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের এটি সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট। বস্তুর গতি যত বাড়তে থাকবে, ভর তত বাড়তে থাকবে। গতি বাড়তে বাড়তে যখন আলোর গতির কাছাকাছি পৌছে যাবে তখন ভর অসীম হয়ে যাবে। বস্তু যদি আলোর গতিতে পৌছে যায় তাহলে তা শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ কোন বস্তুর পক্ষেই আলোর গতিতে থাকা সম্ভব নয়। যদি তা আলোর গতিতে পৌছে যায় তাহলে তা আর পদার্থ হিসেবে আচরণ করবে না বরং শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যাবে।

এই জন্যেই বলা হয়ে থাকে যে, আমাদের এই মহাবিশ্ব দুটি জিনিস দ্বারা গঠিত।

  • পদার্থ (যার ভর আছে) এবং
  • শক্তি (যার ভর নেই)

পদার্থ শক্তিতে রুপান্তরিত হতে পারে আবার শক্তি পদার্থে রুপান্তরিত হতে পারে। উদাহরণ সরূপ যখন হিরোসিমা কিংবা নাগাসাকিতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ হলো তখন এতো শক্তি কোথা থেকে আসলো? এই শক্তি কোন রাসায়নিক শক্তি থেকে আসেনি। বরং পরমাণুর ভাঙ্গনের ফলে যখন চেইন রিয়েকশান চলে তখন কিছু পদার্থ শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। এটি পরমানুর মধ্যে সঞ্চিত শক্তির একটি নমুনা মাত্র। মাত্র কয়েকগ্রাম পদার্থের মধ্যে সঞ্চিত শক্তি দিয়ে পুরো পৃথিবীর চেহারা পাল্টে দেয়া সম্ভব। অবিশ্বাস্য লাগল, তাই না?

এর পর আসা যাক পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য নিয়ে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী শূন্য থেকে এই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের এই স্পেস যা ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে তার কিছুই ছিল না। তাহলে কি ছিলো শুরুতে? এর উত্তর আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মাঝে লুকিয়ে আছে। আর তা হচ্ছে শক্তি। ভর শক্তির নিত্যতা সূত্রের মাঝেই মহাবিশ্বের অসংখ্য না জানা প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে।  

শেষকথা

আমার এই লেখায় আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের অতি সাধারণ একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পাঠকগণ কতটুকু অনুধাবন করতে পেরেছেন তা অবশ্যই কমেন্টস সেকশনে আমাকে জানাবেন। লেখার ভূল ভ্রান্তি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ!


Leave a Reply

Close Menu